চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা ধরে রাখার মিশনে আজ মাঠে নামছে প্যারিস সেন্ট-জার্মেই (পিএসজি)। বুদাপেস্টের ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ আর্সেনাল।আজ শনিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় শুরু হবে শিরোপার এই লড়াই।
আর্সেনাল কখনোই এই ট্রফি জেতেনি। তবে দীর্ঘ ২২ বছর পর এবার ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জেতায় আত্মবিশ্বাসে ফুটছে মিকেল আর্তেতার দল। ফরাসি চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে ইউরোপসেরার মুকুট পরতে উন্মুখ হয়ে আছে তারা।
পুসকাস অ্যারেনায় এই হাইভোল্টেজ ম্যাচের আগে দুই দলের পাঁচটি মূল শক্তির জায়গা ও চ্যালেঞ্জের দিকে নজর দিয়েছে এএফপি স্পোর্টস।
আর্সেনালের সেট-পিস শক্তি
এই মৌসুমে আর্তেতার দল ওপেন প্লে থেকে গোল করতে মাঝেমধ্যে ভুগলেও, ডেড বল বা সেট-পিস পজিশনে প্রতিপক্ষের জন্য যমদূত হয়ে উঠেছে।
কর্নারের সময় আর্সেনালের দীর্ঘদেহী খেলোয়াড়রা প্রতিপক্ষের বক্সে রীতিমতো আতঙ্ক সৃষ্টি করেন, বিশেষ করে সেন্টার-ব্যাক গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস। ফাইনালে পিএসজির গোলরক্ষক মাটভে সাফোনভকে তারা প্রচণ্ড চাপে রাখার চেষ্টা করবেন, যাকে পিএসজি রক্ষণভাগের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা ভাবা হচ্ছে।
দলটির সেট-পিস কোচ নিকোলাস জোভেরকে এই কাজে বিশ্বের সেরা মানা হয়। প্রিমিয়ার লিগে আর্সেনালের করা গোলগুলোর প্রায় ৪০ শতাংশই এসেছে এমন সেট-পিস থেকে।
আর্সেনালের এই কৌশল নিয়ে পিএসজি কোচ লুইস এনরিকে বলেন, ‘অনেকে বলতে পারেন তারা দলগতভাবে চমৎকার কম্বিনেশনে গোল করে না। কিন্তু তাতে কী আসে যায়? আর্সেনালের যেকোনো সমর্থককে জিজ্ঞেস করে দেখুন, তারা এই কৌশলে দল জিতলে অবশ্যই খুশি।’
পিএসজির গতিময় বাঁ দিক
কুঁচকির চোট কাটিয়ে জুরিয়েন টিম্বারের দলে ফেরাটা আর্সেনালের জন্য স্বস্তির। কারণ এই ম্যাচে কোচ আর্তেতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে পিএসজির বাঁ দিক সামলানো।
পিএসজির উইঙ্গার খভিচা কভারাতসখেলিয়া এবার টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। দলটির হয়ে ইতিমধ্যে ১০টি গোল করেছেন তিনি। আর তার পেছনে লেফট-ব্যাক পজিশনে থাকা নুনো মেন্দেস আক্রমণে ওঠার ক্ষেত্রে দারুণ গতিময়।
আড়াই মাস পর ফেরা টিম্বারকে আর্তেতা সরাসরি একাদশে নামাবেন, নাকি ডান দিকে ক্রিস্টিয়ান মসকেরার ওপর ভরসা রাখবেন—সেটাই এখন দেখার বিষয়। টিম্বারের অনুপস্থিতিতে ডেকলান রাইসকেও এই পজিশনে খেলানো হয়েছিল, তবে পিএসজির মাঝমাঠের চালিকাশক্তি ভিতিনহাকে রুখতে রাইসকে আজ সেন্ট্রাল মিডফিল্ডেই বেশি প্রয়োজন হবে।
ক্লান্তির পরীক্ষা
ফাইনালে আর্সেনালের সম্ভাব্য শুরুর একাদশের বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই এই মরসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩,০০০ মিনিটের বেশি খেলেছেন। ডেকলান রাইস, উইলিয়াম সালিবা, গ্যাব্রিয়েল, মার্টিন জুবিমেন্ডি ও ডেভিড রায়ার মতো তারকারা তো মাঠে কাটিয়েছেন ৪,০০০ মিনিটেরও বেশি।
কোচ আর্তেতা নির্দিষ্ট কিছু খেলোয়াড়ের ওপরই পুরো মরসুম ভরসা রেখেছেন। তবে ক্লান্তি নিয়ে কোনো অজুহাত দিতে রাজি নন এই স্প্যানিশ কোচ। গত মাসে লিগ লড়াইয়ের চড়া উত্তেজনার মধ্যে তিনি বলেছিলেন, ‘এটাই বাস্তব পরিস্থিতি এবং আমাদের এটি মেনেই সুযোগটি উপভোগ করতে হবে।’
ঠিক বিপরীত চিত্র পিএসজি শিবিরে। ফরাসি লিগ ওয়ানে গত ১৪ বছরের মধ্যে ১২তম শিরোপা আগেই নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় কোচ লুইস এনরিকে তার মূল খেলোয়াড়দের পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
এই মরসুমে পিএসজির মাত্র তিনজন খেলোয়াড়—উইলিয়ান পাচো, ভিতিনহা ও ওয়ারেন জাইর-এমেরি ৩,০০০ মিনিটের বেশি খেলেছেন। ফাইনালের আগে এনরিকে বলেন, ‘বিশ্রামও প্রস্তুতির একটা বড় অংশ, বিশেষ করে এই ধরনের বড় ম্যাচের আগে।’
ক্লিন শিটের রেকর্ড
দুই দলের পরিসংখ্যান বলছে, ফাইনালটি হতে যাচ্ছে পিএসজির ‘অপ্রতিরোধ্য আক্রমণ’ বনাম আর্সেনালের ‘দুর্ভেদ্য রক্ষণ’ ভাঙার লড়াই।
চলতি টুর্নামেন্টে আর্সেনাল এখন পর্যন্ত অপরাজিত এবং গোল খেয়েছে মাত্র ৬টি। গোলরক্ষক ডেভিড রায়া ৯টি ম্যাচে কোনো গোল না খেয়ে (ক্লিন শিট) সর্বকালের রেকর্ড ছুঁয়েছেন। রক্ষণে তার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন গ্যাব্রিয়েল ও উইলিয়াম সালিবা জুটি। ব্যালন ডি’অরজয়ী ওসমানে দেম্বেলে, খভিচা কভারাতসখেলিয়া ও দেজিরে দুয়েদের নিয়ে গড়া পিএসজির আক্রমণভাগকে আজ এই দেয়াল ভাঙতে হবে।
অন্যদিকে পিএসজি এই টুর্নামেন্টে গোল করেছে ৪৪টি। ১৯৯৯-২০০০ মরসুমে বার্সেলোনার গড়া ৪৫ গোলের রেকর্ড ছুঁতে আর মাত্র ১ গোল দরকার তাদের।
লুইস এনরিকের মস্তিস্ক ও চমক
সেমিফাইনালের প্রথম লেগে বায়ার্ন মিউনিখকে ৫-৪ ব্যবধানে হারিয়েছিল পিএসজি। তবে দ্বিতীয় লেগে চতুর কোচ লুইস এনরিকে সবাইকে চমকে দিয়ে কৌশল বদলে ফেলেন। মিউনিখের মাঠে চরম রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে ১-১ গোলে ড্র করে ফাইনাল নিশ্চিত করে প্যারিসের দলটি।
প্রতিপক্ষকে চমকে দিতে ভালোবাসেন এনরিকে। আর্সেনালকে রুখতেও বিশেষ পরিকল্পনার আভাস দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সাধারণত যেভাবে খেলি, ওদের হারাতে হলে আজ তার চেয়ে ভিন্নভাবে খেলতে এবং ডিফেন্ড করতে হবে।’
সেমিফাইনালে বায়ার্নের বিপজ্জনক উইঙ্গার মাইকেল অলিসকে বোতলবন্দী করতে গোলরক্ষক সাফোনভকে দিয়ে বারবার বল মাঠের বাইরে পাঠানোর কৌশল নিয়েছিলেন এনরিকে।
পিএসজির এই চমক নিয়ে আর্সেনাল বস আর্তেতা বলেন, ‘তারা প্রতিটি ম্যাচে কী করে, আমরা সব বিশ্লেষণ করেছি। সম্ভাব্য সব পরিস্থিতির জন্য আমরা প্রস্তুত।’
