প্রায় আড়াইশ বছরের পুরোনো জেলা শহর ময়মনসিংহ। পর্যটনশিল্পের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। প্রাচীনকাল থেকে সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা।
কিন্তু অপার সম্ভাবনা সত্ত্বেও ময়মনসিংহের পর্যটনশিল্প এগোচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যথাযথ উদ্যোগ ও সঠিক পরিকল্পনা না থাকার কারণে ময়মনসিংহে পর্যটন শিল্পের প্রসার কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
পর্যটন গবেষক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ সজল কোরায়শী বলেন, ‘ময়মনসিংহ অঞ্চলটি তার সমৃদ্ধ ইতিহাস, অনন্য লোকজ সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তবে পর্যটন নগরী হিসেবে পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে এর চমৎকার কিছু সম্ভাবনা রয়েছে।’
হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ার পাহাড়ি সীমান্ত এলাকা এবং ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের মনোরম পরিবেশ পর্যটকদের মুগ্ধ করার ক্ষমতা রাখে। মৈমনসিংহ গীতিকা, লোকজ গান এবং গ্রামীণ মেলা এ অঞ্চলের মূল শক্তি। তেমনি কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
কোরায়শী বলেন, ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা আন্তর্জাতিক মানের পর্যটক টানতে সক্ষম। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস নিজেই একটি বড় পর্যটন কেন্দ্র। এর বিশাল এলাকা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, জার্মপ্লাজম সেন্টার ও কৃষি মিউজিয়াম শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণার জায়গা হতে পারে। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মন্ডাসহ স্থানীয় খাবারগুলো ফুড-ট্যুরিজমের বড় সম্ভাবনা তৈরি করে।’
পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটি ময়মনসিংহ অঞ্চলের সদস্যসচিব ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘শিল্প-সংস্কৃতির নগর হিসেবে পরিচিত ময়মনসিংহ। ১৭৮৭ সনে এই শহরের পত্তন হয়। ২৩৮ বছরের প্রাচীন এই জেলায় আছে পর্যটনশিল্পের অপার সম্ভাবনা, কিন্তু স্থানীয় ও প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাবে পর্যটনশিল্পের প্রসার ঘটছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ময়মনসিংহ জেলা শহরের পাশাপাশি আশপাশের উপজেলাগুলোতে দর্শনীয় স্থান থাকলেও ভ্রমণপিপাসুরা জানেন না পর্যটনসমৃদ্ধ এসব স্থানের খবর। জেলায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত ঘোষিত পুরাকীর্তি আছে ১১টি। এগুলোর ইতিহাস সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্ম খুবই কম জানেন।’
প্রত্নতত্ব ঢাকা বিভাগের মাঠ কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন জানান, ময়মনসিংহে রয়েছে প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা যা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য হতে পারে খুবই আকর্ষনীয়।
প্রত্নতত্ব সূত্র জানায়, জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র রয়েছে শশী লজ, ময়মনসিংহ জাদুঘর, আলেকজান্ডার ক্যাসেল, গৌরীপুর লজ, রাজ রাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কস এবং বিপিন পার্ক।
আরও রয়েছে—স্বাধীনতার স্তম্ভ; পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ, এর তীরবর্তী জয়নুল উদ্যান; ত্রিশালের নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়; মুক্তাগাছায় আটআনী জমিদারবাড়ি, মহারাজা সূর্যকান্তের বাড়ি, শতাব্দি প্রাচীন মন্দির; গৌরীপুরে রাজবাড়ি, বীরাঙ্গনা সখিনার মাজার ও রামগোপালপুর জমিদারবাড়ি; ফুলবাড়িয়ার আনারস বাগান, রাবার বাগান ও বড়বিলা বিল; ভালুকার কাদিগড় জাতীয় উদ্যান ও কুমিরের খামার; হালুয়াঘাটের গাবরাখালী পার্ক ও ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমি; ধোবাউড়ার চীনা মাটির টিলা; গফরগাঁওয়ে আবদুল জব্বার স্মৃতি জাদুঘর; এবং ঈশ্বরগঞ্জে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত আঠার বাড়ী জমিদারবাড়ি যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে।
প্রত্নতাত্বিক গবেষক স্বপন ধর বলেন, ‘লোক সংস্কৃতি, লোক উৎসব, লোকসংগীত, লোকগাঁথার তীর্থস্থান ময়মনসিংহ। ময়মনসিংহের একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। মৈমনসিংহ গীতিকার মহুয়া, মলুয়া, চন্দ্রাবতী, দেওয়ানা মদিনা পালাসহ কমলা, দেওয়ান ভাবনা, দস্যু কেনারাম, কাজলরেখার পালা বিশ্ব সাহিত্যে খুবই নন্দিত। মৈমনসিংহ গীতিকা আশ্রিত স্মৃতি চিহ্নগুলোও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য হতে পারে অপার আনন্দের খোরাক।’
বৃহত্তর ময়মনসিংহ পর্যটনের লীলাভূমি হতে পারে দাবি করে স্বপন ধর আরও বলেন, ‘ময়মনসিংহ অঞ্চলে আরো অনেক পর্যটন সমৃদ্ধ স্থান রয়েছে যেমন-নেত্রকোণায় সোমেশ্বরী নদী, চিনামাটির পাহাড়, বিরিশিরি ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার কালচারাল একাডেমী, চন্দ্রডিঙ্গা ঝর্ণাধারা, কমলা রাণীরি দিঘী, ডিঙ্গাপোতা হাওর, টংক শহীদ মোমোরিয়াল, রাণীখং মিশন; শেরপুরে রয়েছে মধুপিলা ইকো পার্ক, পৌনে তিনআনি জমিদার বাড়ি, গজনী অবকাশ কেন্দ্র, রাজার পাহাড়, পানিহাটা-তাড়ানি পাহাড়; কিশোরগঞ্জে জঙ্গলবাড়ী দূর্গ, এগারসিন্ধু দূর্গ, শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ, পাগলা মসজিদ, শহীদি মসজিদ, শাহ মখদুম মসজিদ, তালজাঙ্গা জমিদার বাড়ি; এবং জামালপুরে রয়েছে গান্ধী আশ্রম, হজরত শাহ জামাল (র:) মাজার, জিলবাংলা সুগার মিল এবং দয়াময়ী মন্দির।’
কবি আলী ইউসুফ জানান, সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করলে এ জেলা হবে দেশের অন্যতম পর্যটন জেলা। ‘সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ এ জেলায় কালচারাল ট্যুরিজম গড়ে তোলাও সম্ভব,’ বলেন তিনি।
গবেষক এবং সংস্কৃতি কর্মীরা আরও জানান, একটি পরিকল্পিত ‘ট্যুরিজম মাস্টার প্ল্যান’-এর মাধ্যমে এই সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব। ব্রহ্মপুত্র নদ খনন, ঐতিহাসিক ভবনগুলোর সংস্কার ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করলে ময়মনসিংহ হয়ে উঠবে বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এমন উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য সঠিক পরিকল্পনা, সংস্কার ও প্রচার প্রয়োজন।
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো সাইফুর রহমান বলেন, ‘জেলার পর্যটন বিকাশের জন্য তারা কাজ করছেন।’ পাশাপাশি এই জেলায় যেসব ঐতিহ্যবাহী ও ইতিহাসসমৃদ্ধ স্থাপনা আছে, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহযোগিতায় সেগুলো উন্নয়নের জন্য কাজ করা হবে বলেও তিনি জানান।
