দেশের প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আরণ্যক’ নাট্যদল। তার লেখা মঞ্চনাটক দেশের সীমানা পেরিয়ে পৃথিবীর বহু দেশে প্রশংসা কুড়িয়েছে। টেলিভিশন নাটকেও রয়েছে তার অসামান্য অবদান।
সম্প্রতি অভিনয়জীবনের শুরু এবং শৈশবের স্মৃতি নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন মামুনুর রশীদ। কীভাবে অভিনয়ের প্রতি প্রেম জেগেছিল, শুনিয়েছেন সেই গল্প।
মামুনুর রশীদ বলেন, ‘ছোটবেলায় যাত্রা দেখতাম। কী দুর্দান্ত অভিনয়! কনকনে শীতের রাতে যাত্রা দেখার কথা কখনো কী ভোলা সম্ভব? স্মৃতির পাতায় পাতায় রয়ে যাবে সেই সুন্দর মুহূর্তগুলোর কথা। যাত্রাপালার সিংহাসন দেখে কত কী ভাবতাম! অভিনয় দেখে প্রচণ্ড মুগ্ধ হতাম। মনে মনে ভাবতাম, একজন অভিনেতার কী ক্ষমতা। যাত্রাপালার অভিনেতা মঞ্চে উঠে অভিনয় করতে গিয়ে বলতেন এই যে সিংহাসন। এই যে রাজপ্রাসাদ। মুহূর্তে মনে হতো, ওই বুঝি সত্যিকারের সিংহাসন! সত্যিকারের প্রাসাদ!’
সেই সময়ের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সেই সময় টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতীর একটি সুপরিচিত জায়গার নাম বল্লা। আব্বা চাকরি করতেন সেখানে। বল্লা করোনেশন স্কুলে পড়ালেখা করার সময় যাত্রাপালার দিকে ঝুঁকে পড়ি। তা-ও আবার পালিয়ে দেখতাম। রোমাঞ্চকর সেই অনুভূতি। সেটা অন্য রকম ভালোবাসা। যাত্রা দেখতে দেখতে অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্মে। সত্যি কথা বলতে, যাত্রাপালা দেখে অভিনয়ে এসেছিলাম।’
মামুনুর রশীদ বলেন, ‘সেই সময়ে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরের ভারতেশ্বরী হোমস সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল যে ওখানে বুঝি ছেলেমেয়ে সবাই পড়ালেখা করতে পারে। পরে জানতে পারি, ওখানে শুধু মেয়েরা পড়ালেখা করে। তখন মির্জাপুরে আসতাম নৌকা করে। রণদাপ্রসাদ সাহা তখন বেঁচে ছিলেন। মির্জাপুরে বড় বড় যাত্রার দল আসত। বেড়াতে গিয়ে ওখানে যাত্রা দেখার সুযোগ হয়েছিল স্কুলজীবনে। অভিনয়ের প্রতি আরও তীব্র আগ্রহ জন্ম নেয় আমার ভেতরে।’
ছোটবেলার পূজার সময়ের কথা উল্লেখ করে মামুনুর রশীদ বলেন, ‘পূজার ছুটিতে মির্জাপুরে যাত্রাপালা হতো বেশি। এত জীবন্ত ছিল তাদের অভিনয়! এত সুন্দর ছিল তাদের অভিনয়! আমার কল্পনার রাজ্য বড় হতে লাগল। শুধু ভাবতাম, একজন অভিনেতা এত শক্তিশালী? একজন অভিনেতার এত ক্ষমতা? হাজার হাজার মানুষের সামনে তারা অভিনয় করে? তারা হাসায়, কাঁদায়। কত বড় ক্ষমতা একজন অভিনেতার?’
স্মৃতির পাতায় খুঁজে ফেরেন মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, ‘দিন যায়, অভিনয়ের প্রতি আমার ভালোবাসা বেড়েই চলে। এরপর আমার আব্বা বদলি হয়ে এলেন এলেঙ্গা। ওখানে জমিদারবাড়ি ছিল। যাত্রাপালা হতো। বড় বড় যাত্রার দল আসত। অভিনয় দেখে আমার ভাবনা প্রসারিত হতে শুরু করে। লেখাপড়া করি, আর ভাবি, যদি অভিনয় করতে পারতাম? ভালো ছাত্র ছিলাম। কিন্তু অভিনয়ের নেশাটা ছাড়তে পারি না। অভিনয় আমাকে পেয়ে বসে।’
ঢাকায় আসার পর রেডিওতে নাটক শোনার স্মৃতি জানিয়ে মামুনুর রশীদ বলেন, ‘একসময় ঢাকা চলে আসি। তখন আকাশবাণীতে নাটক শুনতাম। প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়েই শুনতাম। এখানে-সেখানে ভর্তি হই, মন বসে না। একসময় পলিটেকনিকে ভর্তি হই। আরও পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করি। কিন্তু আমার ভেতরে অভিনয়ের নেশা, অভিনয় আমাকে করতেই হবে, সেটা যেভাবেই হোক।’
মামুনুর রশীদ বলেন, ‘১৯৬৪ সালের শেষ দিকে দেশে টেলিভিশন এল। এটা ছিল বড় বিস্ময়। ১৯৬৬-৬৭ সালের দিকে টেলিভিশনের জন্য প্রথম নাটক লিখলাম। আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমাম প্রযোজনা করেন। ১৯৬৮ সালে আমার লেখা নাটক প্রচার হলো।’
তিনি জানান, টেলিভিশনের জন্য লেখা তার প্রথম নাটকের নাম “চেনামুখ”।
মামুনুর রশীদ আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে শহীদুল্লা কায়সারের সংশপ্তক উপন্যাসের নাট্যরূপ দিই টেলিভিশনের জন্য। তখন হুরমতি চরিত্রে অভিনয় করেন চলচ্চিত্রের নায়িকা রোজী। এভাবেই এই জীবনে কত শত নাটকে অভিনয় করেছি, কত শত নাটক লিখেছি। অভিনয়জীবন এখনো চলছেই।’
