চলমান নির্মাণকাজ ও বৃষ্টিতে রাজধানীর ৪টি প্রধান প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ ইতোমধ্যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পরিবহন মালিক ও যাত্রীরা আশঙ্কা করছেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কার করা না হলে আসন্ন ঈদুল আজহাকে ঘিরে ঘরমুখো মানুষ তীব্র যানজটে পড়তে পারেন।
একইসঙ্গে রাজধানী ঢাকায় কোরবানির পশুবাহী ট্রাক নির্বিঘ্নে প্রবেশ করলে ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।
দেশের সাতটি প্রধান জাতীয় মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশ ৯৪টি যানজটপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ঢাকার প্রবেশ ও বের হওয়ার ৪টি পয়েন্টও রয়েছে।
মাঠপর্যায়ের দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের প্রতিবেদন ও আলোকচিত্রের ভিত্তিতে এই পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাইপাইল, কাঞ্চন সেতুর সংযোগ সড়ক ও এশিয়ান হাইওয়ের কিছু অংশ, সাসেক প্রকল্পের আওতাধীন কাঁচপুর সেতুর কাছে যাত্রামোড়া এলাকা এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকা।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, সড়কের বেহাল অবস্থার বিষয়টি ১১ মে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বৈঠকে তুলে ধরা হয়। এছাড়া, পরদিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকেও এ নিয়ে আলোচনা হয়।
হাইওয়ে পুলিশ বলছে, ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ২৫টি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ২১টি, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ৮টি, ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ৭টি করে এবং ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের ১টি ঝুঁকিপূর্ণ।
ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে চলমান ফ্লাইওভার, ওভারপাস ও এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ এলাকা, সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ, সেতুর সংযোগ সড়ক, টোলপ্লাজা, বাস টার্মিনাল, শিল্পাঞ্চল, বাজার ও ইউ-টার্ন।
পোশাক কারখানা ছুটির পর অনেক মানুষ একসঙ্গে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়; সে সময় এই পয়েন্টগুলোতে তীব্র যানজট হতে পারে। পাশাপাশি মহাসড়কের পাশে বসা অস্থায়ী পশুর হাট যানজট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, সতর্ক করেছে পুলিশ।
প্রতিবেদনে হাইওয়ে পুলিশ, নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা, ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত এবং ঈদের সময় অতিরিক্ত জনবল মোতায়েনের সুপারিশ করেছে।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদক নারায়ণগঞ্জ, সাভারের বাইপাইল, টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। দেখা গেছে, সড়কগুলোর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ এবং গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে ইতোমধ্যেই নিয়মিত যানজট তৈরি হচ্ছে।
পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট ও যাত্রীরা বলছেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও এশিয়ান হাইওয়েতে (ঢাকা বাইপাস) সংস্কারকাজ চালু থাকায় নারায়ণগঞ্জের তিনটি প্রধান মহাসড়কে ঈদের আগে যানজট আরও বাড়বে।
গত ১৬ ও ১৭ মে কাঁচপুর, যাত্রামুড়া, বরাব, রূপসী ও ভুলতা এলাকার একাধিক স্থানে যানজট দেখা গেছে। বৃষ্টিতে সড়কের খানাখন্দে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।
তারাব মোড়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মোছা. সাথী। নারায়ণগঞ্জ থেকে তিনি গুলিস্তান যাবেন। সাথী বলেন, ‘প্রায় আধাঘণ্টা হয়ে গেছে, কিন্তু যানজটের কারণে বাস আসছে না। যানজট না থাকলে পাঁচ মিনিট পরপর বাস আসতো।’
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) সোহেল রানা স্বীকার করেন, নির্মাণকাজ চালু থাকায় সড়ক সরু হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে বৃষ্টির কারণে জেলার তিনটি মহাসড়কেই যানজট পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ।
সাভারের ঢাকা-আশুলিয়া সড়কের যাত্রীরা জানান, জলাবদ্ধতা, খানাখন্দ ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজের কারণে আগে যেখানে যেতে ৪৫ মিনিট লাগতো, এখন ২ ঘণ্টার বেশি সময় লাগছে।
সম্প্রতি বাইপাইল থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে, জলাবদ্ধতা ও চলমান নির্মাণকাজের কারণে ধীরগতিতে চলছে যানবাহন। কোথাও কোথাও দুই লেনের কাজ শেষ হয়ে, তবে অন্য অংশগুলো এখনো চলছে।
প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, আগে দুই লেনের এই সড়কে ড্রেনেজ ব্যবস্থা দুর্বল ছিল। সেই সঙ্গে আশেপাশের কারখানার কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হতো।
তিনি আরও বলেন, এক্সপ্রেসওয়ের পিলার নির্মাণের কারণে সড়কের ক্ষতি হয়েছে।
এখন এটি ৪ লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। ঈদের আগে সাড়ে ৩ কিলোমিটার অংশ খুলে দেওয়া হবে এবং বাকি দেড় কিলোমিটার জুলাইয়ের মধ্যে চালু হবে। ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।
টাঙ্গাইলে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যমুনা সেতুর কাছে এলেঙ্গা ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হয়নি। এটি যানজটের বড় কারণ হতে পারে। প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার যানবাহন ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ব্যবহার করে। ঈদের সময় এই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।
একই মত দেন বাসচালক মো. শহীদুল। তিনি বলেন, ‘মহাসড়কের অবস্থা খুব একটা খারাপ না। তবে সমস্যা এলেঙ্গা ফ্লাইওভার।’
যাত্রী ও চালকদের আশঙ্কা, ঈদযাত্রা ও ঈদ শেষে ঢাকায় ফেরা মানুষের চাপে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আশুগঞ্জ গোল চত্বর থেকে সরাইল বিশ্বরোড পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার অংশে তীব্র যানজট সৃষ্টি হতে পারে। এই করিডরটি ৬টি জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকাকে যুক্ত করেছে।
তাদের মতে, আশুগঞ্জ-আখাউড়া চার লেন প্রকল্পের কাজ খুবই ধীরে এগোচ্ছে। আশুগঞ্জ ও বিশ্বরোড গোল চত্বরের কাজও অসমাপ্ত। এছাড়া দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সড়কের পাশে যানবাহন পার্কিং এবং অটোরিকশা ও ইজিবাইকের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল পরিস্থিতি আরও বেশি জটিল করে তুলেছে।
চালকদের অভিজ্ঞতা, এই অংশ পার হতে প্রায়ই ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় লাগে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ-ভারতের অর্থায়নে ৫ হাজার ৭৯১ কোটি টাকায় ৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ আশুগঞ্জ-আখাউড়া মহাসড়ক ৪ লেনে উন্নীত করার প্রকল্পটি ২০২০ সালে শুরু হয়।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক শামীম আহমেদ বলেন, পুনর্নকশা, অর্থসংক্রান্ত জটিলতা এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শ্রমিকদের চলে যাওয়ার কারণে কাজের গতি কমে যায়।
‘সামগ্রিক অগ্রগতি ৬২ শতাংশে পৌঁছেছে, আর তৃতীয় প্যাকেজের চুক্তি কাজ শুরুর আগেই বাতিল করা হয়েছে,’ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন তিনি।
হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি হাবিবুর রহমান খান বলেন, যানজটপ্রবণ স্থানগুলোর তালিকা ইতোমধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (আরএইচডি) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তারা ঈদের আগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা, গবাদি পশুবাহী ট্রাক ও ঘরমুখো যাত্রীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে গুরুত্বপূর্ণ টোলপ্লাজা, সেতুর সংযোগ সড়ক ও নির্মাণ এলাকায় মোবাইল স্ট্রাইকিং ফোর্স, উদ্ধারকারী দল দায়িত্ব পালন করবে। সেই সঙ্গে থাকবে রেকার।
তারপরও জনবল ও লজিস্টিক পর্যাপ্ত না—মনে করেন তারা। হাইওয়ে পুলিশের প্রায় ৩ হাজার ৩০ জন সদস্য এবং টহল পিকআপ ভ্যান মাত্র ৯৯টি। হাইওয়ে পুলিশকে ৩ হাজার ৯৯০ কিলোমিটারের বেশি জাতীয় মহাসড়ক ও ৪২৫ কিলোমিটার আঞ্চলিক সড়ক তদারকি করতে হয়। অর্থাৎ ১টি গাড়ি নিয়ে প্রতি ৪৪ কিলোমিটার টহল দিতে হয়। এর মধ্যে ৭টি টহলযান বর্তমানে অকেজো।
হাইওয়ে পুলিশ ৪টি বিভাগ, ৮টি অঞ্চল, ১০টি সার্কেল, ৭৩টি থানা ও ৯টি ক্যাম্পের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
কর্মকর্তারা জানান, যানজট সামাল দেওয়া ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ঈদের আগে ডেপুটেশনে প্রায় ৯৯০ অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হতে পারে।
তারা আরও বলেন, জাতীয় মহাসড়ক নেটওয়ার্ক কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ৬ হাজার সদস্য ও ২৫০টি টহলযান প্রয়োজন।
[এই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করতে নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা সৌরভ হোসেন সিয়াম, সাভারের আকলাকুর রহমান আকাশ, টাঙ্গাইলের মির্জা শাকিল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংবাদদাতা মাসুক হৃদয় সহযোগিতা করেছেন।]

