২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেশী ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পূর্ণ মাত্রার সামরিক আগ্রাসন শুরু করে রাশিয়া। এরপর চার বছরেরও বেশি সময় কেটে গেলেও এখনো এই যুদ্ধ বন্ধের তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
এই যুদ্ধ নিয়ে অনেক ধরনের ‘বয়ান’ প্রচলিত আছে। তার মধ্যে একটি জনপ্রিয় বয়ান হলো, রাশিয়া এই যুদ্ধে তাদের ‘সেরা’ অস্ত্রগুলো ইচ্ছা করেই ব্যবহার করছে না।
শুধু পুরনো ও বাতিল হয়ে যাওয়া সোভিয়েত আমলের ট্যাংক, মরচে ধরা অস্ত্র ও মূল সেনার বদলে অনিয়মিত ও ভাড়াটে সেনাদের যুদ্ধে পাঠাচ্ছেন ভ্লাদিমির পুতিন—এমনটাই বলতে চান কোনো কোনো বিশ্লেষক।
এরই মাঝে খবর এলো, এক অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে পুতিনের বাহিনী। চায়ের কাপে ঝড় তুলেছে এই অস্ত্র! চলছে জল্পনাকল্পনা। কি এই ওরেশনিক?
গত চার বছরে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়া অন্তত তিন বার তাদের পরমাণু সক্ষমতা সম্পন্ন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রকে ‘ওরেশনিক’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
ক্রেমলিনের মতে, এটি একটি অত্যাধুনিক অস্ত্র, যা কোনো ভাবেই প্রতিহত করা সম্ভব নয়।
ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গতকাল রোববার এই মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে কিয়েভের বিলা সের্কভা শহরের কাছে একটি অজ্ঞাত অবস্থানে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এই হামলার মাধ্যমেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে ওরেশনিক।
জানুয়ারির শুরুতে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ওরেশনিক ব্যবহার করে ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলের লভিভ প্রদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস ডিপোতে হামলা চালায় রাশিয়া। স্থানীয় কর্মকর্তারা বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
রুশ ভাষায় হ্যাজেল গাছের নামে নামকরণ করা এই ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রথম ব্যবহার হয় ২০২৪ সালে। ইউক্রেনের নিপ্রো শহরের একটি কারখানায় আঘাত হানে এটি।
তবে পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম হলেও ওই তিন হামলায় ব্যবহৃত ওরেশনিকের ‘মাথায়’ এ রকম কোনো অস্ত্র রাখা হয়নি বলে জানিয়েছে মস্কো।
বস্তুত ওয়ারহেড বলতে বোঝানো হয় ক্ষেপণাস্ত্রের ‘গোলাবারুদ’।
এটি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। পারমাণবিক বোমা, গুচ্ছ বোমা, এমন কী, কেমিক্যাল বোমাও থাকতে পারে এতে। আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রে বিভিন্ন ধরনের ওয়ারহেড বহনের সক্ষমতা দিয়ে তৈরি করা হয়।
রাশিয়ার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওরেশনিক একটি মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। অর্থাৎ এটি তিন থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার (এক হাজার ৮৬০ থেকে তিন হাজার ৪০০ মাইল) দুরের লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারে।
রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ও আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পের দায়িত্বে আছেন স্ট্র্যাটেজিক রকেট ফোর্সের কমান্ডার সের্গেই কারাকায়েভ।
তিনি জানান, ওরেশনিক সমগ্র ইউরোপজুড়ে হামলা চালাতে সক্ষম।
রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো জানিয়েছেন, তার দেশে ইতোমধ্যে ওরেশনিক মোতায়েন করা হয়েছে।
মস্কো আরও আগেই ঘোষণা দিয়েছে, এই ক্ষেপণাস্ত্রটি এখন রুশ সেনাবাহিনী সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করছে।
ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ভলগোগ্রাড-এর কাছাকাছি অবস্থিত কাপুস্টিন ইয়ার থেকে সর্বশেষ হামলাটি করা হয়েছে।
২০২৪ সালে পুতিন বলেন, ওরেশনিক ’১০-২০ ধরনের ওয়ারহেড বসানো যায়। এগুলো হোমিং ওয়ারহেড।’
অর্থাৎ এই ওয়ারহেডগুলো গতিপথ পরিবর্তনশীল লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা চালাতে পারে।
তবে পুতিন নিশ্চিত করেন, এতে কোনো পারমাণবিক ওয়ারহেড যুক্ত করা হয়নি।
যার ফলে, এটা কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র নয় এবং সঠিক লক্ষ্যে আঘাত হানার পর এখান থেকে কোনো ধরনের পারমাণবিক দূষণের সম্ভাবনা নেই।
তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মত, ওরেশনিকে পারমাণবিক অস্ত্র যোগ করা সম্ভব।
পুতিন জানান, এই ক্ষেপণাস্ত্রের বিধ্বংসী উপকরণগুলো সূর্য-পৃষ্ঠের সমান উত্তাপ সৃষ্টি করতে পারে।
‘যার ফলে, ওরেশনিক বিস্ফোরিত হওয়ার পর বিস্ফোরণের কেন্দ্রে যা কিছু থাকে, তা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু-পরমাণুতে বিভাজিত হয়ে পরিশেষে ধুলায় পরিণত হয়’, যোগ করেন তিনি।
রুশ নেতা আরও জানান, অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং মাটির অনেক গভীরে লুকিয়ে রাখা লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানতে পারে ওরেশনিক।
২০২৪ সালে নিপ্রোর হামলায় প্রথমবার ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সামান্য ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কয়েকটি দালানের ছাদ উড়ে যাওয়া এবং কিছু পুড়ে যাওয়া গাছ ছাড়া আর কোনো দৃশ্যমান ক্ষতি হয়নি।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা মত দেন, সম্ভবত ওই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে ফাঁকা ওয়ারহেড ব্যবহার করা হয়েছিল।
তবে বাসিন্দারা হামলার সময় ‘ভয়াবহ শব্দ’ ও অত্যন্ত উজ্জ্বল আলোর কথা উল্লেখ করেন।
পুতিনের দাবি, ওরেশনিক এতোটাই দ্রুতগামী যে সবচেয়ে আধুনিক আকাশ হামলা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষেও একে প্রতিহত করা সম্ভব নয়।
এই ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতিবেগের চেয়েও দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসে—এ কারণেই এটি ‘হাইপারসনিক’ তকমা পেয়েছে।
এটি মাক ১০ গতিতে চলে। অর্থাৎ, সেকেন্ডে আড়াই থেকে তিন কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারে ওরেশনিক।
তবে কয়েকজন বিশেষজ্ঞদের মত, এই ক্ষেপণাস্ত্রটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো দ্রুতগতিতে চললেও এই ধারার অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্রের মতো নিক্ষেপের পর খুব বেশিবার গতিপথ বদলাতে পারে না।
২০২৪ সালে পোলিশ ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (পিআইএসএম)-এর বিশ্লেষক মারসিন আন্দ্রেজ পিওত্রোস্কি বলেন, ‘অন্যান্য মধ্যম ও আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো এটি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার পর হাইপারসনিক গতিবেগ অর্জন করে এবং লক্ষ্যে আঘাত হানে।’
‘তবে প্রথাগত হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো ওরেশনিক হাইপারসনিক গতি অর্জনের পর আর গতিপথ বদলায় না। যার ফলে, আকাশ হামলা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অতটা বিপাকে পড়ে না’, যোগ করেন তিনি।
পুতিন দাবি করেন, ওরেশনিক কোনো পুরনো, সোভিয়েত আমলের অস্ত্রের আধুনিকায়ন নয়। এটি একটি ‘অত্যাধুনিক’ অস্ত্র।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ওরেশনিককে একটি ‘পরীক্ষামূলক’ ক্ষেপণাস্ত্র আখ্যা দেয়। তাদের মতে এটি রাশিয়ার আরএস-২৬ রুবেঝ আইসিবিএম এর আদলে তৈরি।
রুশ কমান্ডার কারাকায়েভ জানান, এই ক্ষেপণাস্ত্র একটি ‘স্থলভিত্তিক মধ্যমপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র’।
২০২৩ সালের জুলাইতে এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির নির্দেশ দেন ভ্লাদিমির পুতিন।
