ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার তাদের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতি কার্যকর করা শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে অবৈধ বিদেশিদের আটকে রাখতে মালদহ জেলায় প্রথমবারের মতো একটি ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা বন্দিশিবির চালু করা হয়েছে।
এতে সম্ভাব্য হয়রানি ও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর তকমা পাওয়ার আশঙ্কায় সংখ্যালঘু মুসলমানদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়ছে।
উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ হলো মালদহ জেলার বাসিন্দাদের ধর্মীয় পরিচয়। পশ্চিমবঙ্গের যে দুই জেলায় মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ তার মধ্যে এটি একটি। মালদহের মোট জনসংখ্যার ৫১ দশমিক ২৭ শতাংশ মুসলমান।
জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, মালদহের ইংলিশ বাজারের চন্দন পার্ক এলাকায় এই হোল্ডিং সেন্টারটি স্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সেখানে ছয় জনকে আটকে রাখা হয়েছে। গত রোববার গাজোলের পান্ডুয়া এলাকা থেকে তিন নারী ও ছয় শিশুসহ নয়জনকে সেখানে নেওয়ার হয়।
এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, কেন্দ্রটিতে সিসিটিভি ক্যামেরাসহ কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘হোল্ডিং সেন্টারটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বর্তমানে সেখানে নয়জন বাংলাদেশিকে রাখা হয়েছে। তাদের প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও আইনি প্রক্রিয়া চলছে। আটকদের সঙ্গে নির্ধারিত আইনি বিধি মেনেই আচরণ করা হচ্ছে।’
ভারতের স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ক্ষমতায় বসার প্রথম দিনেই তারা সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে বিএসএফকে জমি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। এর কয়েকদিনের মাথাতেই তারা এবার বন্দিশিবির তৈরি করল।
এর দুদিন আগে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্যবিষয়ক দপ্তরের বিদেশি শাখা সব জেলা প্রশাসনকে একটি নির্দেশ পাঠায়। সেখানে ‘আটক বিদেশি’ এবং ‘সাজা শেষে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকা বিদেশি বন্দিদের’ জন্য হোল্ডিং সেন্টার স্থাপনের কথা বলা হয়।
রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সাড়ে তিন কোটি মুসলমানের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের ভাষা ও সাংস্কৃতিক মিল রয়েছে। বিজেপির অভিযোগ, বাংলাদেশি মুসলমানরা ভারতে অনুপ্রবেশ করে সেখানকার জনসংখ্যার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। সদ্য শেষ হওয়া নির্বাচনে একেই মুখ্য এজেন্ডা হিসেবে সামনে আনে বিজেপি।
অতীতে বিজেপির শীর্ষ নেতারা বাংলাদেশিদের ‘উইপোকা’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে আখ্যায়িত করেন।
গত ২০ মে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) আওতাভুক্ত সম্প্রদায়গুলো এই নতুন প্রক্রিয়ার বাইরে থাকবে। সিএএ অনুযায়ী বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ভারতে গেলে ছয়টি ধর্মের মানুষ আইনি সুরক্ষা পাবেন। এই ছয় ধর্মের তালিকায় মুসলমানদের রাখা হয়নি।
এএফপি জানিয়েছে, প্রতিবেশী আসাম রাজ্যেও বিজেপি সরকার একই ধরনের নীতি নিয়েছে। সেখানেও নাগরিকত্ব যাচাই অভিযান চালানো হয় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষকে বন্দিশিবিরে আটক রাখা হয়, যাদের প্রায় সবাই ধর্মে মুসলমান।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই আসাম থেকে শত শত মানুষকে ধরে এনে রাতে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এমনটি করা হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, অনেককে বন্দুকের মুখে সীমান্ত পার হতে বাধ্য করা হয়েছে।
