যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে সম্মত ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, ট্রাম্প অনুমোদন দিলেই কার্যকর

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের সব ধরনের বাধাও তুলে নিতে রাজি হয়েছে দুই পক্ষ। 

আজ শুক্রবার একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই তথ্য জানিয়েছে। 

তবে এখনো এই প্রস্তাবে অনুমোদন দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অপরদিকে, ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম দাবি করেছে, চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। 

এ বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চার সূত্র জানান, নতুন চুক্তি অনুযায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ৬০ দিন বাড়বে। এ সময় কৌশলগত দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকবে। 

ওই দুই মাসে মধ্যস্থতাকারীরা ইরানের পরমাণু প্রকল্পসহ অন্যান্য জটিল বিষয়গুলো নিয়ে দরকষাকষিতে সহায়তা করবেন। 

যদি তেহরান-ওয়াশিংটনের নেতারা এতে সম্মতি দেন, তবে এটাই হবে ২৮ ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত শুরুর পর শান্তি প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় উদ্যোগ। 

দুই দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা শুরুর পর এই সম্ভাব্য চুক্তির খবর এলো।

এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি শুরুর পর এটাই ছিল সর্বশেষ পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা। 

প্রস্তাবিত চুক্তির বিষয়ে সবচেয়ে প্রথম প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। 

ট্রাম্প এখনো অনুমোদন দেননি, ইরান এখনো এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি—আপাতত এই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। 

ইরানের সংবাদসংস্থা তাসনিম শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক সূত্রের বরাত দিয়ে জানান, চুক্তির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত ও নিশ্চিত হয়নি।  

এর আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা (শান্তি চুক্তির) খুব কাছাকাছি আছি। তবে এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।’

‘আমরা সেখানে পৌছাবো, এমন নিশ্চয়তা দিতে পারছি না। তবে এ মুহূর্তে আমি বিষয়টি নিয়ে আশাবাদী’, যোগ করেন ভ্যান্স।

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন বেশ কয়েকবার দাবি করেছে, ‘যুদ্ধের অবসান হতে চলেছে’। তবে প্রতিবারই ইরান এ ধরনের দাবি নাকচ করেছে। 

চুক্তির খসড়া অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে কোনো বাধা থাকবে না। এটি বাস্তবায়ন করতে যুক্তরাষ্ট্রকেও ইরানের বন্দরের বিরুদ্ধে আরোপিত ‘ব্লকেড’ তুলে নিতে হবে। চুক্তির অংশ হিসেবে, ইরানের তেল বিক্রির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধও আংশিকভাবে তুলে নেবে ওয়াশিংটন।  

সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রচারের পর তেলের দাম কমেছে। 
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ পথটি শিগগির চালু হবে। 

এর আগে, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টকম জানায়, তারা ইরান থেকে আসা পাঁচটি সশস্ত্র ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত বন্দর আব্বাস শহর থেকে ষষ্ঠ ড্রোন ছোঁড়ার মুহূর্তে তা প্রতিহত করে এবং নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে আঘাত হানে।

অপরদিকে, কুয়েতের সেনাদের দাবি, তাদের দেশের দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। 

উল্লেখ্য, কুয়েতে বড় একটি মার্কিন সেনা ঘাঁটি আছে।   

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টিভিতে দাবি করা হয়, দেশটির বুশেহর শহরের কাছে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে এই দাবি অস্বীকার করেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। 

ইরানের বিপ্লবী রক্ষিবাহিনী দাবি করে, তারা বন্দর আব্বাসে হামলার জন্য দায়ী মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে প্রতিশোধ নিয়েছে। আবার হামলা এলে আরও মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখানোর হুমকি দিয়েছে তারা। 

কুয়েত এই হামলার নিন্দা জানিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। 

মধ্যপ্রাচ্যে ঈদুল আজহার আনন্দকে ম্লান করেছে এসব হামলার ঘটনা। 

পাকিস্তান জানিয়েছে, তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার আজ শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ওয়াশিংটনে দেখা করবেন। তবে মধ্যস্থতাকারী দেশটির এই উদ্যোগের তাৎপর্য বা কারণ স্পষ্ট নয়।

মার্চের ১৫ তারিখের পর থেকে ট্রাম্প বারবার বলে এসেছেন, ‘যেকোনো মুহূর্তে’ যুদ্ধের অবসান ঘটবে। তবে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ইরানের দাবির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদার যোজন যোজন পার্থক্য দুই পক্ষের বিভিন্ন বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

ইরান চায় তাদের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার হোক, দেশের বাইরে থাকা সম্পদগুলো মুক্ত করে দেওয়া হোক এবং এ অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনাবাহিনী সরে যাক। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পাকাপাকি ভাবে বন্ধ হোক। তেহরানের দাবি, এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য নিবেদিত। 

পাশাপাশি, ইরানের দাবি, যেকোনো শান্তি চুক্তিতে লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। 

তবে লেবাননের বিরুদ্ধে চলমান আগ্রাসন থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেননি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। প্রতিদিন লেবাননে প্রাণঘাতি হামলা অব্যাহত রেখেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত নেতানিয়াহু। 

আরও ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও, দুই পক্ষের চিন্তা, চাহিদা ও দাবির মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান ঘুচিয়ে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা এখনো সুদূর পরাহত। 

এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা।

 

Related Articles

Latest Posts