যে সেভ বদলে দিয়েছিল বিশ্বকাপের ভাগ্য

শব্দহীন আতঙ্কেরও একটি রং আছে। সেটি হয়তো ফ্যাকাশে। হয়তো নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা কোনো সন্ধ্যার মতো। আবার কখনও সেটি এমন এক মুহূর্তের রং, যখন কোটি কোটি মানুষ একই সঙ্গে ভবিষ্যৎকে হারিয়ে যেতে দেখে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই কোথাও একজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকেন, যিনি ভাগ্যের লেখা বদলে দেন।

আর্জেন্টিনার জন্য ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ কয়েক সেকেন্ড ছিল ঠিক তেমনই এক সময়।

লুসাইল স্টেডিয়ামে সেদিন রাতটা অন্তত আর্জেন্টাইনদের জন্য শুধু একটা ফাইনাল ছিল না, ছিল ৩৬ বছরের তৃষ্ণার চূড়ান্ত পরীক্ষা। সে লড়াই কেবল দুটো দেশের নয়, যেন দুটো যুগ মুখোমুখি। একদিকে মেসির শেষ বিশ্বকাপের স্বপ্ন, অন্যদিকে এমবাপের ক্ষুধার্ত তারুণ্য।

প্রথমার্ধ ছিল আর্জেন্টিনার। দ্বিতীয়ার্ধেও। দুই গোলে এগিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা যখন গোনা শুরু করেছে বিজয়ের মিনিট, ঠিক তখনই কিলিয়ান এমবাপের যাদু। পেনাল্টি, তারপর গোল। ব্যবধান কমে ২–২। অতিরিক্ত সময়ে লিওনেল মেসি আবার এগিয়ে নিলেন দলকে। কিন্তু এমবাপে থামার পাত্র নন। হ্যাটট্রিক। ৩–৩।

এই ম্যাচ শেষ হওয়ার নামই নিচ্ছিল না।

টাইব্রেকারের জন্য সবাই প্রায় মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। ঠিক তখনই ঘটে সেই ঘটনা। ১২৩তম মিনিটে। ফরাসি আক্রমণভাগে বল আসে। মুহূর্তের মধ্যে একটি পাস ছিন্ন করে দেয় আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ। বল গিয়ে পৌঁছায় র‍্যান্ডাল কোলো মুয়ানির কাছে।

পরের কয়েক সেকেন্ড যেন স্লো মোশনে চলতে থাকে। কোলো মুয়ানি সামনে ছুটছেন। তার সামনে বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাস। কোনো ডিফেন্ডার নেই। কোনো বাধা নেই। শুধু গোলরক্ষক। ফুটবলের ভাষায় এটিকে বলা যায় ‘ড্রিম চান্স’। একজন ফরোয়ার্ড জীবনে এর চেয়ে ভালো সুযোগ খুব কমই পায়। বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ মুহূর্তে একা গোলরক্ষকের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়া, এ যেন স্বপ্নেরও ওপরে কিছু।

আর্জেন্টিনার সমর্থকদের বুকের ভেতর তখন ধ্বংসস্তূপ তৈরি হচ্ছে। ফরাসি সমর্থকেরা উঠে দাঁড়িয়েছেন। কোলো মুয়ানি শট নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার চোখে তখন বিশ্বজয়ের নেশা। ৩৬ বছরের অপেক্ষায় থাকা আর্জেন্টিনার স্বপ্ন তখন এক ফরাসি তরুণের বুটের ডগায় কাঁপছে। লিওনেল মেসির জাদুকরী বাঁ পা, ডি মারিয়ার চোখের জল, আর গ্যালারিতে থাকা হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থকের প্রার্থনা, সবকিছু যেন ওই এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের কাছে জিম্মি।

আর সেই সময় এমিলিয়ানো মার্তিনেজ যা করেছিলেন, সেটি কেবল শারীরিক প্রতিক্রিয়া ছিল না; সেটি ছিল একজন গোলরক্ষকের প্রবৃত্তি, সাহস এবং বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার নিখুঁত প্রকাশ।

অনেক গোলরক্ষক এমন পরিস্থিতিতে গোললাইনের কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। কেউ কেউ ঝাঁপ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন। কিন্তু মার্তিনেজ অন্য কিছু করলেন। তিনি অপেক্ষা করেননি। তিনি সামনে এগিয়ে এলেন। নিজের শরীরকে যতটা সম্ভব বড় করে তুললেন। শুটারের জন্য জায়গা কমিয়ে দিলেন। আর যখন শটটি এল, তখন তার ডান পা বিদ্যুতের মতো সামনে বেরিয়ে গেল।

বলটি জালের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু জালে পৌঁছানোর আগেই সেটি থেমে গেল। একটি পায়ে লেগে। একটি সেভে। একটি মুহূর্তে। সেই দৃশ্য দেখে মনে হয়েছিল, সময় যেন থমকে গেছে।

ফরাসি বেঞ্চ হতবাক। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা অবিশ্বাসে তাকিয়ে আছেন। কোলো মুয়ানি নিজেও হয়তো বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে বলটি জালে যায়নি।

এক নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে, এক নিশ্চিত পরাজয়ের খাদ থেকে আর্জেন্টিনাকে একাই টেনে তুললেন মার্তিনেজ। গ্যালারিতে তখন কান্নার বদলে অবিশ্বাসের চিৎকার। ডাগআউটে লিওনেল  স্কালোনি যেন তখনও বুঝেই উঠতে পারছেন না কী ঘটে গেল এইমাত্র। চোখের সামনে থেকে ছিনতাই হয়ে যাওয়া ট্রফিটাকে যেন কেউ জাদুবলে আবার ফিরিয়ে দিয়েছে তাদের হাতে।

এরপর পেনাল্টি শুটআউট। সেখানেও ‘দিবু’, এই ডাকনামটা যেন আর্জেন্টাইন মাটিতে তৈরি হওয়া কোনো কিংবদন্তির উপাধি। ফ্রান্স দুটো পেনাল্টি নষ্ট করে। আর্জেন্টিনা চারটিই গোল। অবশেষে বিশ্বকাপ ট্রফি উঠল মেসির হাতে। কিন্তু এই শিরোনামের নিচে যে মানুষটার নাম লেখা আছে অদৃশ্য কালিতে, সে মার্তিনেজ।

পরে বহু বিশ্লেষক, সাবেক গোলরক্ষক এবং ফুটবল বিশেষজ্ঞ সেই সেভ নিয়ে আলোচনা করেছেন। কেউ বলেছেন, এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা সেভ। কেউ বলেছেন, এটি হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেভ। কারণ সেভটির মূল্য শুধু একটি গোল ঠেকানো নয়; এটি পুরো টুর্নামেন্টের ফলাফল বদলে দিয়েছিল।

ফুটবলে অনেক অসাধারণ সেভ আছে। গর্ডন ব্যাংকসের পেলের হেড ঠেকানো। ইকার কাসিয়াসের রবিনের সামনে দাঁড়িয়ে দেওয়া অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ। অলিভার কানের একের পর এক বিশ্বমানের সেভ। কিন্তু মার্টিনেজের সেভকে আলাদা করে তোলে এর প্রেক্ষাপট।

এটি কোনো গ্রুপ ম্যাচ ছিল না। কোনো কোয়ার্টার ফাইনালও ছিল না। এটি ছিল বিশ্বকাপ ফাইনাল। এবং এটি এসেছিল শেষ মুহূর্তে। যদি সেই বল জালে ঢুকে যেত, তাহলে ফ্রান্স প্রায় নিশ্চিতভাবেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে যেত। মেসির বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে যেত। আর্জেন্টিনার প্রজন্মের পর প্রজন্মের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হতো।

কিন্তু ইতিহাস কখনও কখনও একজন মানুষকে বেছে নেয়। সেই রাতে ইতিহাস বেছে নিয়েছিল এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে।
 

Related Articles

Latest Posts