১৪২৬ ছক্কার আইপিএলে স্যুয়িং জাদুতে ভিন্ন উচ্চতায় ভুবনেশ্বর

এবার আইপিএলে মোট ছক্কা হয়েছে ১৪২৬টি, সব আসরের চেয়ে সর্বোচ্চ। দুইশো রান তাড়া হয়েছে তুড়ি মেরে, এমনকি আড়াইশো রানও হরহামেশা তাড়া হতে দেখা গেছে। ব্যাটারদের জন্য রান প্রসবা উইকেটেও অবিশ্বাস্যভাবে নিজেকে আলাদা করলেন ভুবনেশ্বর কুমার। ৩৬ পেরিয়েও দেখালেন তিনি বাতিল নন। ২৮ উইকেট নিয়েছেন, ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন আটেরও কম। 

বহু বছর ধরে ভুবনেশ্বরকে নিয়ে সবার মনে একটাই প্রশ্ন ছিল— ‘তিনি দারুণ বোলার ঠিকই, কিন্তু তার শরীর কি এই বয়সে ধকল নিতে পারবে?’ বারবার চোট আর দল থেকে বাদ পড়ার কারণে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন তার ক্যারিয়ার শেষ।

কিন্তু এবারের আইপিএলে ভুবনেশ্বর সবাইকে ভুল প্রমাণ করলেন। ১৬ ম্যাচে ২৮টি উইকেট নিয়ে তিনি মৌসুম, যা আইপিএলে তার সেরা।  সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী কাগিসো রাবাদার চেয়ে এক উইকেট কম পেলেও ইকোনমিতে তিনিই সেরা। ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন ৭.৯৫ করে। রাবাদা যেখানে ২৯ উইকেট পেয়ছেন ৯.৬৮ ইকোনমিতে। এতেই বোঝা যায় কতটা প্রভাব বিস্তার করেছেন ডানহাতি স্যুয়িং মাস্টার।  নতুন বলে উইকেট নেওয়া, মাঝের ওভারে রান আটকে রাখা কিংবা ডেথ ওভারে রান না দিয়ে ম্যাচ জেতানো— সব জায়গাতেই তিনি ছিলেন অনবদ্য। 

৩৬ বছর বয়সে এই প্রত্যাবর্তনের মূল চাবিকাঠি ছিল তার ফিটনেস। এর পেছনে রয়েছে ফিটনেস কোচ সূর্য যাদবের সঙ্গে বছরের পর বছর করা কঠিন পরিশ্রম। সূর্য যাদব তার শরীর রোগা বা ভারী করার দিকে নজর না দিয়ে, তাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী বানানোর ওপর জোর দেন।

ভুবনেশ্বরের ওয়ার্কআউট রুটিন পুরো বদলে ফেলা হয়েছিল। একসময় তিনি ৬০ কেজি ওজন নিয়ে স্কোয়াট করতেন, যা এখন বাড়িয়ে ১১০ কেজির ওপরে নিয়ে যাওয়া হয়। এই শক্তির কারণে তার শরীরের জোর এবং গতি দুটোই বাড়ে। ভুবনেশ্বর কখনই অতিরিক্ত গতির বোলার ছিলেন না, তার শক্তি ছিল নিখুঁত লাইন-লেংথ আর সুইং। দিনেশ কার্তিকও তাকে জাসপ্রিত বুমরাহের পর ভারতের সেরা পেসার বলেছিলেন। কিন্তু বর্তমান ক্রিকেটে টিকে থাকতে হলে শুধু বুদ্ধি নয়, শরীরের জোরও দরকার। পিঠ, হ্যামস্ট্রিং ও গোড়ালির পুরনো চোট কাটিয়ে উঠতে ভুবনেশ্বরের ফিটনেসে এই নতুন মাত্রা যোগ করা খুব দরকার ছিল।

ফিটনেস বাড়ার সাথে সাথে তার বোলিংয়ের ধারও বাড়ে। তার চেনা সুইং এবং লাইন-লেংথ ব্যাটারদের জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এমনকি বাউন্সার মারার সময় তার পিঠ এখন আগের মতোই চমৎকারভাবে বাঁকে। আইপিএল ফাইনালে গুজরাট টাইটান্সের ওপেনার সাই সুদর্শনকে আউট করার বলটিই তার প্রমাণ।

বোলিংয়ের কিছু টেকনিক্যাল সমস্যাও ঠিক করা হয়েছিল। পিঠের ব্যথার কারণে বল ছাড়ার সময় ভুবনেশ্বরের বুক কিছুটা বেশি খুলে যেত, ফলে সুইং কমে গিয়েছিল। ব্যায়ামের মাধ্যমে সেই সমস্যাও শুধরে নেওয়া হয়।

অনেকেই বয়সের অজুহাত দিয়ে তাকে বাতিলের খাতায় ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জিমি অ্যান্ডারসন যদি চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত দাপটের সঙ্গে খেলতে পারেন, তবে ভুবনেশ্বর কেন নয়? সেটাই যেন দেখালেন তিনি। 

সাধারণত এই বয়সে ক্রিকেটাররা কোনোমতে একটা মৌসুম পার করে দিতে পারলেই খুশি থাকেন। কিন্তু ভুবনেশ্বর দেখিয়ে দিলেন, প্রবল ইচ্ছা আর নিবেদন থাকলে ৩৬ বছর বয়সেও সাফল্যের আরও একটি চূড়া ছোঁয়া সম্ভব।

 

Related Articles

Latest Posts