৩ বছর ধরে বিচারের অপেক্ষায় শিশু, চাইলেন রামিসার ধর্ষক-হত্যাকারীর দ্রুত বিচার

শিশু রামিসা হত্যার বিচার দাবিতে মিরপুরজুড়ে বিক্ষোভের আবহ। পল্লবীতে রামিসার বাসার সামনে মানববন্ধন কিংবা অবস্থান কর্মসূচিতে জড়ো হওয়া মানুষগুলো জানাচ্ছেন ক্ষোভ-নিন্দা। 

এমন এক কর্মসূচিতে গতকাল শুক্রবার এসেছিলেন রামিসার প্রায় সমবয়সী, সাড়ে ৮ বছরের এক শিশু, সঙ্গে তার নানা-নানি।

তিন বছর আগে, ২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল; পল্লবীতে রামিসাদের পাশের এলাকাতেই শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়। অভিযুক্ত আব্দুল জলিল (৪৮) পেশায় ইলেকট্রিক মিস্ত্রি এবং ওই বাসারই কেয়ারটেকার ছিলেন। থাকতেন ঠিক উল্টো দিকের ঘরটিতে।

ঘটনার তিন বছর পেরিয়ে গিয়েছে। ওই মামলার শুনানি এখনো শুরু হয়নি। আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে চলাফেরা করছেন এই সমাজেই। 

পরম মমতায় নাতির একহাত আগলে ধরে রেখেছেন। আরেকটি হাত ধরে রেখেছেন নানি। নানা-নানির কাছে বেড়ে উঠছে শিশুটি। 

তিনজন একাত্ম হয়েছেন রামিসার ধর্ষক ও খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবি নিয়ে। আর মনে করিয়ে দিচ্ছেন এ সমাজের রুঢ় বাস্তবতার—বিচারহীনতার সংস্কৃতির। 

বুকে চাপা কষ্ট নিয়ে শিশুটির নানা বলেন, ‘আসামি গ্রেপ্তার হলেই যে বিচার হয়, সবসময় সেটা সঠিক না।’ 

যে আক্ষেপ ঝরেছে রামিসার বাবার কণ্ঠেও। দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে এসে চেষ্টা করেছেন সন্তান হারানো এই বাবাকে আশ্বস্ত করতে।

যদিও রামিসার জন্য বিচার চাইতে আসা শিশুটির পরিবার কারও আশ্বাস পাননি। উল্টো ভুক্তভোগী হয়েও এলাকা ছাড়তে হয়েছে, যেখানে অপরাধী বুক ফুলিয়ে চলছে সেই সমাজেই।

দ্য ডেইলি স্টারকে ২০২৩ সালের ওইদিনের ঘটনার বিস্তারিত বলেন শিশুটির নানি। প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া নাতি স্কুল থেকে ফিরে পেয়াজু খাওয়ার আবদার করেছিল। সেই আবদার মেটাতে ওকে একা রেখেই বাড়ির বাইরে যান নানি। ফিরে এসে নাতিকে না পেয়ে খোঁজ শুরু করেন। 

সেই সময় প্রতিবেশি জলিলের বাসা থেকে নাতির চাপা চিৎকার ও গোঙ্গানির শব্দ শুনতে পেয়ে এগিয়ে যান। গিয়ে দেখেন দরজা বন্ধ। অন্য প্রতিবেশিদের সহায়তায় দরজা ভেঙে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করেন নাতিকে। 

দ্রুত তাকে নেওয়া হয় স্থানীয় হাসপাতালে। সেখানে অবস্থার অবনতি ঘটায় ১৫ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় শিশুটিকে। 

ঢামেক হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) স্বাস্থ্য পরীক্ষার ভিত্তিতে ওসিসির সুপারিশেই ১৭ এপ্রিল শিশুর নানা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় মামলা করেন। 

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন উপপরিদর্শক তারিক-উর-রহমান শুভ। যোগাযোগ করা হলে ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘আমার মনে আছে, মামলা হওয়ার পরের দিনই আসামিকে আমরা গ্রেপ্তার করি। শিশুটির সামনের ঘরেই থাকতেন ওই আসামি।’

‘ধর্ষণের তথ্য-প্রমাণ সহকারে আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছি। এখনো মামলাটি বিচারাধীন,’ যোগ করেন শুভ।

গ্রেপ্তারের পর ১৯ মাস কারাগারে থাকলেও এখন জামিনে মুক্ত আসামি আব্দুল জলিল। এ নিয়ে ক্ষোভ ও ভয় দুটোই কাজ করে নানা-নানির মনে।

নানা বলেন, ‘আমাদের মনে হয়, ন্যায়বিচার হয়নি। আমার নাতি এখনো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তিন বছর পেরিয়ে গেলেও সে স্বাভাবিক হতে পারিনি। এখনো ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকে।’ 

‘আমরা সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাই। আসামি ধরা পড়লেই সবকিছু না। আইনের অনেক ফাঁকফোকর আছে। সেটি মনে করিয়ে দিতেই আমরা এখানে এসেছি,’ বলেন দুজন।

মামলাটির আইনজীবী ফাহমিদা আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে সফল না হলেও কথা হয় তার সহকারী আলমগীর হোসেনের সঙ্গে। ওসিসি পরিচালিত মামলাগুলোর আইনজীবীদের সহকারীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

মুঠোফোনে মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে নানির বলা ঘটনাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করেন আলমগীর। আসামির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এ মামলায় এখন সে জামিনে মুক্ত আছে। তবে আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে যাচ্ছে। শিগগিরই মামলার সাক্ষী-শুনানি শুরু হবে।’

ওই ‘শিগগির’ আর ‘ন্যায়বিচারে’র অপেক্ষায় এখন সময় গুনছেন নানা-নানি আর তাদের দুজনের হাত ধরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটি।

Related Articles

Latest Posts