রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে বলেছিলেন, মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে একদিন অমরত্ব অর্জন করা সম্ভব হতে পারে। অনেকেই তখন এটিকে দুই বয়স্ক শাসকের সাধারণ আলাপ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল ক্রেমলিন-সমর্থিত একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রকল্পের ইঙ্গিত, যা বর্তমানে রাশিয়ার অন্যতম প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি জগতের ধনকুবের জেফ বেজোস, স্যাম অল্টম্যান বা পিটার থিয়েলের মতো পুতিনও দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্য প্রতিরোধী গবেষণায় আগ্রহী। তবে পার্থক্য হলো, রাশিয়ায় এটি এখন ব্যক্তিগত আগ্রহের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। থ্রিডি অর্গান প্রিন্টিং (অঙ্গ মুদ্রণ), মিনি-শূকরের মাধ্যমে মানব অঙ্গ উৎপাদন, জিনগত চিকিৎসা এবং অতিনিম্ন তাপমাত্রার থেরাপি ব্যবহারসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে গবেষণা চালানো হচ্ছে।
গত মাসে রুশ সরকার ঘোষণা করেছে, ‘নিউ হেলথ প্রিজারভেশন টেকনোলজিস’ নামের ২৬ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্পের আওতায় বিজ্ঞানীরা এমন একটি জিন থেরাপি তৈরি করছেন, যা কোষের বার্ধক্যের গতি ধীর করতে পারে।
রাশিয়ার উপবিজ্ঞানমন্ত্রী ডেনিস সেকিরিনস্কি ২৩ এপ্রিল বলেন, ‘এই ওষুধ বার্ধক্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক সম্ভাবনাগুলোর একটি।’
ল্যাবে মানব অঙ্গ তৈরির পরিকল্পনা
এই প্রকল্পের আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো ল্যাবরেটরিতে মানবদেহের অঙ্গ তৈরি করে প্রতিস্থাপন করা। ২০২৪ সালে পুতিন যে জাতীয় দীর্ঘায়ু কর্মসূচি ঘোষণা করেন, তার অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রযুক্তি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের দাবি, এই উদ্যোগ দশকের শেষ নাগাদ ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষের জীবন রক্ষা করতে সক্ষম হবে।
রুশ বিজ্ঞানীরা বর্তমানে দুটি প্রযুক্তির ওপর জোর দিচ্ছেন—বায়োপ্রিন্টিং (ত্রিমাত্রিক প্রিন্টারে জীবন্ত টিস্যু তৈরি) এবং জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন (মিনি-শূকরের শরীরে মানব অঙ্গ উৎপাদন)। ইতোমধ্যে তারা মানব কার্টিলেজ টিস্যু ও ইঁদুরের থাইরয়েড গ্রন্থি তৈরি করার দাবি করেছেন।
ক্রেমলিনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘রাশিয়ায় এ ক্ষেত্রে বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক কর্মসূচি চালু রয়েছে। রাষ্ট্র এসব প্রকল্পকে সমর্থন দিচ্ছে এবং বহু গবেষণা প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নিচ্ছে।’
নেতৃত্বে পুতিনকন্যা ও ঘনিষ্ঠ মিত্র
এই দীর্ঘায়ু প্রকল্পের নেতৃত্বে রয়েছেন পুতিনের মেয়ে এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট মারিয়া ভোরন্তসোভা এবং পদার্থবিদ মিখাইল কোভালচুক। কোভালচুক সোভিয়েত আমলের বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুরচাতভ ইনস্টিটিউটের প্রধান।
কোভালচুকের মতে, ভবিষ্যতে বিজ্ঞান এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে, যেখানে মানুষের শরীরের বিভিন্ন অংশ অনির্দিষ্টকাল ধরে মেরামত ও প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, ‘অমরত্ব নিয়ে আলোচনা করা কঠিন, তবে মানুষের শরীর মেরামতের সক্ষমতা অবশ্যই বাড়বে।’
সমালোচনা ও প্রশ্ন
তবে এই প্রকল্প নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের অনুরূপ গবেষণার তুলনায় রাশিয়ার এসব উদ্যোগ থেকে আন্তর্জাতিক মানের বৈজ্ঞানিক জার্নালে খুব কম গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।
রাশিয়ার বায়োপ্রিন্টিং প্রযুক্তির অন্যতম পথিকৃৎ আলেকজান্ডার অস্ত্রোভস্কি বলেন, ‘যদি প্রকাশিত গবেষণা না থাকে, তবে প্রকৃত ফলাফলও নেই। এসব বক্তব্যকে বাস্তব অর্জনের চেয়ে আকাঙ্ক্ষা বা স্বপ্ন বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত।’
ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পর দেশ ছেড়ে যাওয়া অস্ত্রোভস্কির মতে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘সম্ভবত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পুতিনকে তার পছন্দসই কথাই শোনানো হচ্ছে।’
বিজ্ঞান, রাজনীতি ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব
কোভালচুক দীর্ঘায়ু গবেষণাকে পশ্চিমবিরোধী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও যুক্ত করেছেন। তিনি একসময় দাবি করেছিলেন, পশ্চিমা দেশগুলো এমন ‘অনুগত মানুষ’ তৈরির পথে এগোচ্ছে, যাদের চিন্তাশক্তি ও প্রজনন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এমনকি তিনি কোভিড-১৯ মহামারির পেছনেও যুক্তরাষ্ট্রের হাত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
পুতিন নিজেও অতীতে এ ধরনের ধারণার প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছেন। তার ওপর প্রভাব ফেলেছিল সোভিয়েত যুগের চলচ্চিত্র ‘ডেড সিজন’, যেখানে সিআইএ ও নাৎসি চিকিৎসকদের মানব নিয়ন্ত্রণের ষড়যন্ত্র দেখানো হয়েছিল। পুতিন বলেছেন, এই চলচ্চিত্রই তাকে কেজিবিতে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
বার্ধক্য নিয়ে পুতিনের ব্যক্তিগত উদ্বেগ
৭৩ বছর বয়সী পুতিন দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে শক্তিশালী ও কর্মক্ষম নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। খালি গায়ে শিকার, আইস হকি খেলা কিংবা মোটরসাইকেল চালানোর ছবি সেই ভাবমূর্তির অংশ।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই দৃশ্যমান শক্তিমত্তার আড়ালে বার্ধক্য ও শারীরিক অবক্ষয় নিয়ে তার গভীর উদ্বেগ কাজ করে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় তিনি কঠোর কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, দর্শনার্থীদের জন্য জীবাণুনাশক টানেল ও দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা বাধ্যতামূলক করেছিলেন। তার বিখ্যাত দীর্ঘ বৈঠক টেবিলগুলোও তখন আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
রুশ ও পশ্চিমা গণমাধ্যমে তার চেহারায় সম্ভাব্য কসমেটিক চিকিৎসা বা সৌন্দর্যবর্ধক প্রক্রিয়া নিয়েও জল্পনা রয়েছে।
মৃত্যুকে হারানোর পুরোনো স্বপ্ন
রাশিয়ার ইতিহাসে শাসকদের দীর্ঘায়ু বা অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা নতুন নয়। ১৯২০-এর দশকে সোভিয়েত বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার বগদানভ রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে তারুণ্য ফিরিয়ে আনার পরীক্ষা চালান। পরে সেই পরীক্ষার ফলেই তার মৃত্যু হয়।
পরবর্তীতে চিকিৎসক ওলেক্সান্দর বোগোমোলেতস দাবি করেছিলেন, মানুষ ১৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। তিনিও তুলনামূলক কম বয়সেই মারা যান।
বর্তমানে রাশিয়ায় পুরুষদের গড় আয়ু প্রায় ৬৮ বছর, যা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
সবশেষে সমালোচকদের মন্তব্য, নির্বাচনকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করা যায়, মৃত্যুকে তেমন সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না—এমনকি ক্রেমলিনের পক্ষেও সম্ভব নয়।
