৭ নম্বরে নেমে ১৫ বলে ৩২ রানের ক্যামিওতে ৩টি ছক্কা, বল হাতে ১৪ রানে ৩ উইকেট, সঙ্গে দুর্দান্ত ফিল্ডিং— জোফরা আর্চার যে একাই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন, তা নতুন কিছু নয়। তবে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের বিপক্ষে যেভাবে তিনি অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের সবটুকু মেলে ধরলেন, টুর্নামেন্টের এই ধাপে এমন নৈপুণ্যে দ্বিতীয়বার রাজস্থানকে আইপিএল মুকুটের স্বপ্নও ডানা মেলছে প্রধান কোচ কুমার সাঙ্গাকারার মনে।
জোফরা আর্চারের কথা মাথায় এলে প্রথমেই কী মনে পড়ে? উত্তরটা সহজ— বল হাতে গতি আর নিখুঁত লাইন-লেন্থ, গতিময় ফিল্ডিং আর লোয়ার-অর্ডারে মূল্যবান কিছু রান। এবার ভাবুন, এই সবকিছুর মেলবন্ধন যদি একই ম্যাচে দেখা যায়! গত রবিবার মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের বিপক্ষে রাজস্থান রয়্যালসের বাঁচা-মরার ম্যাচে ঠিক এই রূপেই দেখা দিলেন আর্চার।
আইপিএলে ৬৬ ম্যাচের ক্যারিয়ারে বল হাতে তার বহু দুর্দান্ত স্পেল আছে। তবে অলরাউন্ডার হিসেবে ম্যাচের ওপর এমন একচ্ছত্র প্রভাব সম্ভবত এবারই প্রথম দেখালেন এই ইংলিশ তারকা।
এদিন ১৩তম ওভারে ১১৯ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে যখন রাজস্থান কিছুটা বিপদে, তখন ৭ নম্বরে ব্যাটিংয়ে নামেন আর্চার। খেলেন আইপিএল ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। এরপর বল হাতে পাওয়ারপ্লেতেই শিকার করেন ২ উইকেট। আর মাঝের ওভারে যখন ম্যাচ রাজস্থানের হাত থেকে ফসকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন ফিরে এসে ভাঙেন গুরুত্বপূর্ণ এক জুটি।
টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে আর্চারের বড় বড় ছক্কা মারার সামর্থ্যকে বরাবরই নিয়মিত স্কিলের চেয়ে প্রতিপক্ষের জন্য কেবল এক ধরনের ‘হুমকি’ হিসেবে দেখা হতো। রাজস্থান রয়্যালস অবশ্য ব্যাটার আর্চারকে নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। দলের হয়ে তিনি ৭ বা তার ওপরে ব্যাটিং করেছেন আটবার। এমনকি একবার তাকে দিয়ে ওপেনও করানো হয়েছিল, যদিও সেবার ৪ বলে শূন্য রানে ফেরেন তিনি।
রবিবার ধ্রুব জুরেলের বিদায়ের পর আর্চারকে ৭ নম্বরে পাঠায় আরআর। পরে জানা যায়, রবীন্দ্র জাদেজার কবজির চোটে পড়ার কারণে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। আর্চার কেবল দু-একটা বড় শট খেলতে পারলেও এই জুয়া খেলতে রাজি ছিল দল। শুরুতে তার ব্যাটিংয়ের ধরনও তেমন ছিল। ইনিংসের শুরুতে একটু ওপর দিয়ে মারতে গিয়ে টাইমিং পাচ্ছিলেন না। তবে দ্রুতই নিজেকে সামলে নিয়ে বুঝেশুনে আক্রমণ শুরু করেন।
ম্যাচ শেষে রাজস্থানের ডিরেক্টর অব ক্রিকেট কুমার সাঙ্গাকারা বলেন, ‘আমার মনে হয় আজকের উইকেট বেশ ভালো ছিল, শুরুতে কিছুটা ধীরগতির হলেও জোফরা যেভাবে ব্যাটিং করেছে তা অসাধারণ। সে আসলে বেশ দক্ষ ব্যাটার, মোটেও ৮ নম্বরের ক্রিকেটার নয়। ও যখন মনোযোগ দেয়, তখন প্রমিজিং একজন ব্যাটার হয়ে ওঠে। ওর শটে শক্তি ও বুদ্ধি— দুটোই আছে।’
দীপক চাহারকে লং-অফের ওপর দিয়ে ওড়ানো বিশাল ছক্কায় খাতা খোলেন আর্চার, যা ছিল তার মুখোমুখি হওয়া সপ্তম বল। পরের ওভারে করবিনে বশের শর্ট বলকে সীমানাছাড়া করেন নিজের দ্বিতীয় ছক্কায়। আর শার্দুল ঠাকুরের বলে ওড়ানো তৃতীয় ছক্কাটি আসে স্কয়ার লেগ দিয়ে দুর্দান্ত এক পুল শটে। ছক্কার মাঝে দ্রুত সিঙ্গেলস ও ডাবলসের মাধ্যমে রানের গতি সচল রাখেন তিনি। ১৮তম ওভারে যখন তিনি আউট হন, ১৫ বলে তার ৩২ রানের ইনিংসটি কেবল দলের সংগ্রহই বাড়ায়নি, ম্যাচের মোড়ও ঘুরিয়ে দেয়।
প্লে-অফের আগে আর্চারের ব্যাটিংয়ের এই নতুন রূপ রাজস্থানের জন্য বড় স্বস্তি হতে পারে, বিশেষ করে দলের মিডল অর্ডার যেখানে নিয়মিত জ্বলে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছে।
সাঙ্গাকারা বলেন, ‘সংকট মুহূর্তে ওকে ওপরের দিকে ব্যাটিংয়ে নামানো নিয়ে আমাদের আগে কথা হয়েছিল। পেস কিংবা স্পিন— যেকোনো পরিস্থিতি সামলানোর সামর্থ্য ওর আছে। দলে এমন একজন থাকা বড় সুবিধা। আজ ছিল জোফরার পালা। দলে এমন বিকল্প থাকা দারুণ ব্যাপার।’
এরপর দেখা গেল সেই চেনা আর্চারকে, যিনি একাই প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইন-আপ গুঁড়িয়ে দিতে পারেন। যদিও চলতি মৌসুমে তার পথচলা এতটা সহজ ছিল না। পাওয়ারপ্লেতে এবার বেশি উইকেট পেলেও গত কয়েকটি ম্যাচে এই সময়ে তিনি বেশ খরুচে ছিলেন। আগের তিন ম্যাচে পাওয়ারপ্লেতে কোনো উইকেট না পেয়ে উল্টো ১৩.৬৬ ইকোনমিতে রান দিয়েছিলেন তিনি।
তবে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের বিপক্ষে নিজের চেনা ধার ফিরে পান আর্চার। গতি ও সুইংয়ের দারুণ প্রদর্শনীতে শুরুতেই কাঁপিয়ে দেন প্রতিপক্ষের টপ অর্ডার। প্রথমেই ফেরেন রোহিত শর্মা। আর্চারের ১৪৫ কিলোমিটার গতির আউটসুইঙ্গারে ড্রাইভ খেলতে গিয়ে উইকেটকিপারের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। নিজের পরের ওভারে আরও এক বিধ্বংসী ডেলিভারিতে নমন ধীরকে বোল্ড করেন আর্চার। বাতাসে সুইং করে ভেতরে ঢোকা বলটি আঘাত হানে মিডল স্ট্যাম্পে। শর্ট ও ফুল লেংথের চমৎকার মিশ্রণে পাওয়ারপ্লেতে ৩ ওভার বল করে মাত্র ১৪ রানে ২ উইকেট নেন তিনি।
ম্যাচ শেষে আর্চার জানান, কোচ তাকে অতিরিক্ত স্লোয়ার না দিয়ে নিজের শক্তির জায়গায় অনড় থাকতে বলেছিলেন। সম্প্রচারকারীদের আর্চার বলেন, ‘প্রথম দুই ম্যাচের পর কোচের নির্দেশ ছিল, আমি স্লোয়ার দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম দেখে তিনি বলেন— “তুমি কী করবে আমি জানি না, তবে আমি তোমার গতি কমাতে দেখতে চাই না।” তাই এখন আমি কেবল কোচের কথাই শুনছি। গতি বজায় রেখে বল করলে ভুলের সুযোগ কিছুটা কম থাকে।’
মাঝের ওভারে সূর্যকুমার যাদব ও হার্দিক পান্ডিয়া যখন রাজস্থানের ২২০ রান টপকানোর হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন ধারণার চেয়ে একটু আগেই ১৬তম ওভারে আর্চারকে আক্রমণে আনেন অধিনায়ক। তবে এবার কোচের নির্দেশনার বাইরে গিয়ে চতুরতার আশ্রয় নেন তিনি। ১১৬ কিলোমিটার গতির এক স্লোয়ার শর্ট-লেংথ ডেলিভারিতে হার্দিককে পরাস্ত করেন। টাইমিং না হওয়ায় বল ওপরে উঠে লং-অফে জমা পড়ে।
আর্চারের ক্যারিয়ারে হয়তো এর চেয়েও বিধ্বংসী ব্যাটিং ক্যামিও কিংবা আরও গতিময় বোলিং স্পেল আছে, তবে এই ম্যাচটি তার অলরাউন্ড সামর্থ্যের পুরো ক্যানভাস ফুটিয়ে তুলেছে। রাজস্থানের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, চোটের কারণে বারবার ক্যারিয়ার থমকে যাওয়া আর্চার অবশেষে কোনো বাধা ছাড়াই নিয়মিত ম্যাচ খেলে যাচ্ছেন।
