একটা গোল কখনো কখনো মানুষের পুরো জীবনটা বদলে দেয়। সেটা শুধু জালে বলের আঘাত নয়, সেটা হয়ে ওঠে একটা মানুষের পরিচয়, তার অস্তিত্বের সারসংক্ষেপ। মারিও গোটজের জীবনে এমন একটা মুহূর্ত এসেছিল। একটাই, কিন্তু সেটাই যথেষ্ট।
২০১৪ সালের বিশ্বকাপ দলে গোটজে ছিলেন, কিন্তু নিয়মিত একাদশে নয়। থমাস মুলার, মেসুত ওজিল, টনি ক্রুসদের দাপটে তিনি বেশিরভাগ সময় বেঞ্চে। তরুণ বয়স, সামনে প্রথম বিশ্বকাপ, অথচ মাঠে নামার সুযোগ কম। অনেকে মনে করতেন, গোটজে হয়তো এবার শুধু দর্শক হয়েই থাকবেন। কিন্তু কোচ ইওয়াখিম লো তাকে বিশ্বাস করতেন। গ্রুপ পর্বে, নকআউটে বিভিন্ন ম্যাচে বদলি হিসেবে নামিয়েছিলেন। গোটজেও প্রতিবার দলের জন্য কিছু একটা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় সুযোগটা এসেছিল সবচেয়ে বড় মঞ্চে।
১৩ জুলাই, ২০১৪। রিও দি জানেইরো। মারাকানা স্টেডিয়াম। ধারণক্ষমতার কাছাকাছি প্রায় ৭৪ হাজার দর্শক। কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের সামনে। একদিকে জার্মানি, অন্যদিকে আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা।
পুরো ম্যাচজুড়ে দুই দলের মধ্যে ছিল তীব্র টানটান উত্তেজনা। নির্ধারিত নব্বই মিনিটের খেলা প্রায় শেষ। ঘড়ির কাঁটা গড়াতে যাচ্ছে অতিরিক্ত সময়ের দিকে। মাঠের সবুজ গালিচা ততক্ষণে পরিণত হয়েছে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধক্ষেত্রে। বাস্তিয়ান সোয়াইনস্টেইগারের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া রক্ত, গঞ্জালো হিগুয়েইনের অবিশ্বাস্য মিস আর লিওনেল মেসির দূরপাল্লার শটগুলো অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় মারাকানার বাতাস তখন রীতিমতো ভারী। খেলোয়াড়দের ফুসফুস জানান দিচ্ছে তারা নিঃশেষিত। ডাগআউটে দাঁড়ানো দুই কোচের চোখেমুখেও তখন রাজ্যের ক্লান্তি আর অজানা এক ভয়।
ম্যাচের বয়স তখন ৮৮ মিনিট। জার্মান কোচ লো যেন অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখতে পাচ্ছিলেন ভবিতব্যকে। তিনি বেঞ্চ থেকে ডেকে নিলেন গোটজেকে। বাইশ বছর বয়সী এক তরুণ, যার চোখেমুখে তখনও কৈশোরের সারল্য। কিন্তু তার কাঁধেই চাপিয়ে দেওয়া হলো এক মহাকাব্যিক দায়িত্ব। মাঠ ছাড়ছেন বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা মিরোস্লাভ ক্লোসে, আর তার শূন্যস্থান পূরণে মাঠে নামছেন গোটজে। এটি কেবল একটি বদলি ছিল না, ছিল এক যুগের সাথে আরেক যুগের নীরব করমর্দন।
টাচলাইনে দাঁড়িয়ে লো যখন গোটজের কাঁধে হাত রাখলেন, তখন তিনি কেবল তাকে মাঠে নামার নির্দেশই দেননি। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে তিনি বুনে দিয়েছিলেন এক ঐশ্বরিক আত্মবিশ্বাস, ‘যাও, বিশ্বকে দেখিয়ে দাও তুমি মেসির চেয়েও সেরা। দেখিয়ে দাও তুমি একাই বদলে দিতে পারো এই ম্যাচের ভাগ্য।’ গোটজে মাথা নাড়লেন। একবুক স্বপ্ন আর অসীম এক নীরবতা নিয়ে তিনি পা রাখলেন মারাকানার সেই ঘামে ভেজা সবুজ ঘাসে।
অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হয়েছে। ১১৩তম মিনিট। আন্দ্রে শুরলে বাঁ দিক থেকে ছুটছেন। আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডাররা বিভ্রান্ত। শুরলে একটা হাই ক্রস বাড়ালেন। উঁচু, বাঁকানো, কোণা থেকে আসা। সাধারণ খেলোয়াড় হয়তো মাথা দিত, হয়তো শট নিতে গিয়ে মিস করত।
গোটজে কী করলেন? বুকে নামালেন বলটা। এক স্পর্শে নিয়ন্ত্রণ। বলটা মাটি ছোঁয়ার আগেই তার শরীরটা বাঁক নিল এক জ্যামিতিক পূর্ণতায়। তারপর, সময় যেন থামল এক সেকেন্ডের জন্য। বাঁ পায়ে ভলি। আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরো হয়তো নিজের জীবনের সেরা ডাইভটি দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই শটটি ঠেকানোর কোনো উপায় মানুষের জানা ছিল না। বল আছড়ে পড়লো জালের একেবারে কোণায়। জালের সেই ঝটপটানি শব্দ যেন নিমেষেই স্তব্ধ করে দিল বুয়েনস আইরেস থেকে শুরু করে গোটা আর্জেন্টিনাকে।
গোটজে দাঁড়িয়ে রইলেন এক মুহূর্ত। হাত দুটো প্রসারিত, মুখে বিস্ময় এবং বিশ্বাসের মিশ্রণ। গোটজে ছুটছেন কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে, শূন্যে ঘুষি ছুঁড়ে উদযাপন করছেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম মুহূর্তটি। তারপর সতীর্থরা ছুটে এলেন, ঢেকে দিলেন তাকে। ক্লোসে, লাম, মুলার সবাই। সেই ছবিটা আজও অনেকের স্মৃতিতে গেঁথে আছে।
ওই গোলটা কারিগরিভাবে অসাধারণ ছিল। বুকে ট্র্যাপ করে ভলি করা, মাঠের যে কোণ থেকে, যে চাপের মধ্যে এটা অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ও পারতেন না। কিন্তু গোটজে সেটা করলেন এমন নিখুঁতভাবে যে মনে হলো মাঠে কেউ নেই, শুধু তিনি আর বলটা।
জার্মানি জিতল ১-০ গোলে। চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা। ১৯৯০-এর পর প্রথমবার। এবং ইতিহাসে প্রথমবার কোনো ইউরোপীয় দল দক্ষিণ আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ জিতল।
পুরস্কার বিতরণীতে মেসি পেলেন গোল্ডেন বল অর্থাৎ সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। কিন্তু সেই রাতে সবার চোখ ছিল গোটজের দিকে। যিনি নেমেছিলেন বদলি হয়ে, আর উঠেছিলেন কিংবদন্তি হয়ে।
