মাঠের লড়াইয়ের আগে কাগজ-কলমের যুদ্ধ: ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক কিছু রেকর্ড

ফুটবল বিশ্বকাপ দরজায় কড়া নাড়লেই এ দেশের আবহাওয়া কেমন যেন বদলে যায়! চায়ের কাপে ঝড় তোলার জন্য শীত বা বর্ষার প্রয়োজন হয় না। কেবল ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে জড়ানো দুই বন্ধুর মুখোমুখি হওয়াই যথেষ্ট। পাড়ার টং দোকান থেকে শুরু করে ফেসবুকের নিউজফিড— সবখানেই এখন তর্কের ঝাঁঝালো গন্ধ। কারণ, বাংলাদেশিদের বিশ্বকাপ-প্রেমের প্রায় পুরোটা জুড়েই তো লাতিন আমেরিকার এই দুই পরাশক্তির ভার্চুয়াল ও বাস্তব ‘যুদ্ধ’, যেখানে কেউ এক চুলও ছাড় দিতে রাজি নয়।

তবে শুধু মুখের কথায় তো আর যুদ্ধ জেতা যায় না! তর্কের ময়দানে প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করতে হলে দরকার অকাট্য যুক্তি আর কিছু জাদুকরী পরিসংখ্যান। যখন কথার লড়াইয়ে আবেগ কাজে দেয় না, তখন ঠান্ডা মাথায় ছুড়ে দেওয়া নিজ দলের পক্ষের একটা সঠিক রেকর্ডই হতে পারে আপনার ব্রহ্মাস্ত্র। তাই ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা— যে দলেরই সমর্থক হোন না কেন, নিজের ঝুলিতে কিছু ঐতিহাসিক সত্য জমা রাখা এখন সময়ের দাবি।

আসুন, মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই কাগজ-কলমের লড়াইয়ে নিজেদের এগিয়ে রাখি। দুই দলের এমন কিছু চোখধাঁধানো রেকর্ড ও পরিসংখ্যানের দিকে চোখ বোলানো যাক, যা আপনার প্রিয় দলটির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে ঢাল-তলোয়ার হিসেবে কাজ করবে।

ট্রফির শোকেসে আর ফাইনালের মঞ্চে কার দাপট বেশি?

তর্কের শুরুতেই যে প্রশ্নটা সবচেয়ে বেশি ধেয়ে আসে, তা হলো— ‘ভাই, তোমাদের ট্রফি কয়টা?’ এই এক প্রশ্নে যেমন আলোচনা জমিয়ে দেওয়া যায়, তেমনি থামিয়েও দেওয়া যায়।

পরিসংখ্যান বলছে, ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র দল হিসেবে প্রতিটি আসরে (এবারেরটিসহ ২৩ বার) অংশ নিয়েছে সেলেসাওরা। পেলে-রোনালদো নাজারিওদের দেশ ফাইনাল খেলেছে ৭ বার, যার মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ বার (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২) সোনালী ট্রফিটা নিজেদের করে নিয়েছে।

অন্যদিকে, আলবিসেলেস্তেরা এই মহাযজ্ঞে অংশ নিতে যাচ্ছে ১৯তম বারের মতো। ফাইনালের মঞ্চে তারা পা রেখেছে ৬ বার। এর মধ্যে ঘরের মাঠে ১৯৭৮ সালে, দিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুতে ১৯৮৬ সালে আর লিওনেল মেসির হাত ধরে সবশেষ ২০২২ সালে— সব মিলিয়ে তারা জিতেছে ৩টি বিশ্বকাপ।

ট্রফি আর ফাইনালের লড়াইয়ে সেলেসাওরা এগিয়ে থাকলেও বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের সাম্প্রতিক দাপট কিন্তু হেলাফেলা করার মতো নয়!

বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে সার্বিক পারফরম্যান্সে কে কতটা নিখুঁত?

মুখোমুখি তর্কের দ্বিতীয় ধাপে আসে দলগত ধারাবাহিকতার হিসাব-নিকাশ। ব্রাজিল এখানেও নিজেদের ‘হেভিওয়েট’ প্রমাণ করেছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে সর্বোচ্চ ১১৪টি ম্যাচ খেলে তাদের জয় রেকর্ড ৭৬টি, ড্র ১৯টি আর হার মাত্র ১৯টি। প্রতিপক্ষের জালে তারা বল জড়িয়েছে ২৩৭ বার, বিপরীতে গোল হজম করেছে ১০৮টি।

খুব বেশি পিছিয়ে নেই আর্জেন্টিনাও। ৮৮টি ম্যাচ খেলে আলবিসেলেস্তেদের জয় ৪৭টি, ড্র ১৭টি ও হার ২৪টি। তারা প্রতিপক্ষের জাল কাঁপিয়েছে ১৫২ বার, আর তাদের নিজেদের জালে বল জড়িয়েছে ১০১ বার।

বৈশ্বিক মঞ্চের সরাসরি দ্বৈরথে কে কাকে কতটা নাচিয়েছে?

সব তর্ক একদিকে, আর ‘বিশ্বকাপে মুখোমুখি দেখায় কে জিতেছে?’— এই প্রশ্ন সম্পূর্ণ অন্যদিকে। প্রতিবেশী এই দুই পরাশক্তি এখন পর্যন্ত মাত্র ৪ বার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-এ। আর এই ‘সুপার ক্লাসিকো’ খ্যাত দ্বৈরথেও এগিয়ে আছে সেলেসাওরাই। ব্রাজিলের জয় ২টি ম্যাচে, আর্জেন্টিনার ১টিতে আর বাকি ম্যাচটি হয়েছে ড্র।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৭৪ সালে জার্মানির মাটিতে ব্রাজিল ২-১ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারায়। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি ০-০ গোলে ড্র হয়।

এরপর ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে জিকো-সক্রেটিসদের ব্রাজিল ৩-১ ব্যবধানে পরাস্ত করে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে। তবে আলবিসেলেস্তেরা এর মধুর প্রতিশোধ নেয় ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে। শেষ ১৬-র সেই হাইভোল্টেজ ম্যাচে ম্যারাডোনার জাদুকরী পাস থেকে ক্লদিও ক্যানিজিয়ার করা একমাত্র গোলে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে দিয়েছিল আর্জেন্টিনা।

ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব: গোল, অ্যাসিস্ট আর শিরোপার মহিমায় কে এগিয়ে?

দলগত অর্জন তো হলো, এবার আসা যাক ব্যক্তিগত জাদুতে। আর্জেন্টিনার ভক্তদের সবচেয়ে বড় ট্রাম্প কার্ড হলেন রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া মেসি। ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে সবচেয়ে বেশি ২৬টি ম্যাচ খেলার কীর্তি তো তার নামের পাশে আছেই। পাশাপাশি ‘ক্ষুদে জাদুকর’ খ্যাত এই ফরোয়ার্ডের আরও অনেক অর্জন আলবিসেলেস্তেদের জন্য তর্কের বড় শক্তি।

বিশ্বকাপের মঞ্চে সর্বোচ্চ ১১ বার ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছেন মেসি। ইতিহাসে তিনিই একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি দুবার গোল্ডেন বল জিতেছেন। ২০১৪ সালের ব্রাজিল ও ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। অধিনায়ক হিসেবেও সবার চেয়ে বেশি ১৯টি ম্যাচ খেলেছেন মেসি।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে সর্বোচ্চ ২১টি গোলে সরাসরি অবদান রাখার রেকর্ড মেসির দখলে। এই কীর্তি অবশ্য তার আগে করেছিলেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলে। নকআউট পর্বে সর্বোচ্চ ছয়টি অ্যাসিস্ট করার কীর্তিও রয়েছে দুজনের নামের পাশে। এছাড়া, সব বিশ্বকাপ মিলিয়ে গোল করার সবচেয়ে বেশি সুযোগ (৬৭টি) তৈরির রেকর্ডটির যৌথ মালিকানা মেসি ও কিংবদন্তি ম্যারাডোনার।

মেসি ও ম্যারাডোনার পাল্টা জবাবে ব্রাজিল ভক্তরা হয়তো সামনে আনবেন পেলে আর ‘দ্য ফেনোমেনন’ খ্যাত রোনালদোকে। একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ শিরোপা জয় পেলেকে রেখেছে সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর নকআউট পর্ব বা ফাইনালে গোল করার দিক থেকে ২০০২ বিশ্বকাপের নায়ক রোনালদোর জুড়ি মেলা ভার। ১৫টি গোল নিয়ে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা।

একমাত্র ফুটবলার হিসেবে ব্রাজিলের সাবেক অধিনায়ক কাফু তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেছেন (১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০২ সালে)। অন্যদিকে, তার স্বদেশি পেলে তিনটি বিশ্বকাপ জিতলেও চোটের কারণে ১৯৬২ সালের ফাইনালে দুর্ভাগ্যজনকভাবে মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল তাকে।

Related Articles

Latest Posts