ভিসিআরের কথা মনে আছে?

আজ ভিসিআর দিবস। জেন-জি প্রজন্মের অনেকেই হয়তো ভিসিআরের নামই শোনেনি। তাদের কাছে সিনেমা মানেই ইউটিউব, নেটফ্লিক্স বা মোবাইলের একটি অ্যাপ। কিন্তু খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন সিনেমা দেখার জন্য ঘরে আনতে হতো একটি বড়সড় ভিডিও ক্যাসেট। আর সেই ক্যাসেট চালানোর জন্য প্রয়োজন হতো ভিসিআর বা ভিডিও ক্যাসেট রেকর্ডার।

এক সময় পরিবারের সাপ্তাহিক আনন্দের বড় অংশ জুড়ে ছিল এই যন্ত্রটি। সন্ধ্যায় সবাই মিলে বসার ঘরে জড়ো হতো। সবাই টেলিভিশনের সামনে অপেক্ষায় থাকত। তখন ভিসিআরে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো প্রিয় কোনো সিনেমার ক্যাসেট। ছবির মান আজকের মতো ঝকঝকে ছিল না। মাঝেমধ্যে পর্দায় দাগ দেখা যেত, শব্দে ঝিরঝির আওয়াজ থাকত। তবু সেই আনন্দে কোনো কমতি ছিল না।

ভিসিআরের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৫৬ সালে। তবে তখনকার যন্ত্রগুলো ছিল বিশাল আকারের ও টেলিভিশন স্টেশনগুলোর জন্য তৈরি। সাধারণ মানুষের ঘরে ভিসিআর পৌঁছায় ১৯৭০ দশকে। এরপর খুব দ্রুত এটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মানুষ শুধু সিনেমা দেখত না, টেলিভিশনের অনুষ্ঠান রেকর্ড করেও পরে দেখত। আজ আমরা যে কোনো অনুষ্ঠান ‘পজ’ করি, পরে দেখি বা আবার চালাই—এই ধারণার সূচনা হয়েছিল ভিসিআরের হাত ধরেই।

ভিসিআরের জনপ্রিয়তার সঙ্গে বদলে যায় সিনেমা দেখার সংস্কৃতিও। গড়ে ওঠে ভিডিও ভাড়ার দোকান। সপ্তাহান্তে পরিবারগুলো দোকানে গিয়ে সিনেমার ক্যাসেট বেছে আনত।

ভিসিআর শুধু বিনোদনের যন্ত্র ছিল না, এটি ছিল স্মৃতি ধরে রাখার মাধ্যমও। জন্মদিন, বিয়ে, পারিবারিক ভ্রমণ কিংবা স্কুলের অনুষ্ঠান—সবকিছুই ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করে ক্যাসেটে সংরক্ষণ করা হতো। আজও অনেক পরিবারের আলমারির কোণে বা চিলেকোঠায় এমন ক্যাসেট পড়ে আছে, যেখানে বন্দী হয়ে আছে বহু বছর আগের হাসি-কান্নার স্মৃতিগুলো।

ভিসিআরের ইতিহাসে একটি মজার অধ্যায় হলো ‘ফরম্যাট যুদ্ধ’। ১৯৭৫ সালে সনি বাজারে আনে বেটাম্যাক্স। এক বছর পর জেভিসি নিয়ে আসে ভিএইচএস। বেটাম্যাক্সের ছবির মান কিছুটা ভালো হলেও ভিএইচএসে দীর্ঘ সময়ের ভিডিও রেকর্ড করা যেত। শেষ পর্যন্ত ভিএইচএসই জয়ী হয় এবং সারা বিশ্বের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।

প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ভিসিআরের গুরুত্ব কমতে থাকে। প্রথমে ডিভিডি, পরে ডিজিটাল ভিডিও এবং স্ট্রিমিং সেবার কারণে ধীরে ধীরে এটি হারিয়ে যায়। ২০১৬ সালে বিশ্বের শেষ বড় ভিসিআর নির্মাতা প্রতিষ্ঠানও নতুন ভিসিআর উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। একটি যুগের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।

তবু ভিসিআর আজও অনেক মানুষের কাছে বিশেষ। কারণ এটি শুধু একটি যন্ত্র নয়, এটি স্মৃতির নাম। ক্যাসেট রিওয়াইন্ড করার শব্দ, প্রিয় অনুষ্ঠান রেকর্ড করার চেষ্টা, কিংবা পরিবারের সবাই মিলে সিনেমা দেখার মুহূর্ত—এসবই এক প্রজন্মের শৈশব ও কৈশোরের অংশ।

জাতীয় ভিসিআর দিবস মূলত যুক্তরাষ্ট্রে পালিত হয়। তবে বিশ্বের নানা দেশে প্রযুক্তিপ্রেমী মানুষ ও নস্টালজিয়ায় ভরা প্রজন্ম এই দিনটিকে স্মরণ করে। কারণ ভিসিআর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি যতই বদলে যাক, কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না।

Related Articles

Latest Posts