বাণিজ্য সচিব পদে কে দায়িত্ব পালন করবেন, তা নিয়ে একধরনের স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। মন্ত্রণালয়ের প্রধান চাচ্ছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েই কাজ করা এক অফিসারকে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রভাবশালী এক অফিসারের আত্মীয়কে এরই মধ্যে বাণিজ্য সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও তাকে গ্রহণ করেননি বাণিজ্যমন্ত্রী।
প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষও বিষয়টি অস্বীকার করেনি। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন ধরনের আলোচনা চলছে।
বাণিজ্য সচিব পদে গত ২৫ মে, অর্থাৎ ১৫ দিন আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আতাউর রহমানকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিনি এ পদে যোগ দিতে পারেননি। তিনি ইকোনমিক ক্যাডারের ১৮তম ব্যাচের অফিসার।
গত ১৭ এপ্রিল বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান মারা যাওয়ার পর থেকে এই মন্ত্রণালয়ে সচিবের চলতি দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খান। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন এ মন্ত্রণালয়ে কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় প্রশাসনের ১৫তম ব্যাচের এই অফিসারকে সচিব হিসেবে চাচ্ছেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
কিন্তু ঈদের ছুটির মধ্যে আতাউর রহমানকে সচিব নিয়োগ দেওয়ায় একধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সেই অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খানকে গত ১ জুন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে। যদিও তিনি এখনো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েই দায়িত্ব পালন করছেন।
এর মাধ্যমে বাণিজ্য সচিব পদটিকে ঘিরে জটিলতা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন প্রশাসনসংশ্লিষ্টরা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক অফিসার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তির নেগোসিয়েশনসহ নানা কারণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কে কার আত্মীয়, এসব বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
বাণিজ্য সচিব হিসেবে প্রজ্ঞাপন জারি হওয়া আতাউর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের হয়তো কোনো অবজারভেশন (পর্যবেক্ষণ) আছে, এটা আমি সরকারের ওপরই ছেড়ে দিয়েছি। আমি যোগদানপত্র দিয়ে রেখেছি, এখন মন্ত্রী মহোদয় যেভাবে…করেন আরকি।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির শনিবার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, সেটাই চলছে। এ ক্ষেত্রেও কোনো ব্যতিক্রম হচ্ছে না।’
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনের শীর্ষ পদে নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে এমন ঠেলা-ধাক্কা দেখা গেছে। গত মার্চ মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন তিনটি প্রতিষ্ঠানের সচিবকে অর্থমন্ত্রীকে না জানিয়েই সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক অফিসার নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, প্রশাসনে কিছু অফিসার নিজেদের সরকারের চেয়েও শক্তিশালী মনে করেন। যে কারণে বিভিন্ন সময়ে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।
এই অফিসার আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এমন কিছু অফিসার ছিলেন। এখন নির্বাচিত সরকারেও এ ধরনের ক্ষমতার চর্চা ভালো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।’
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আরেক অফিসার বলেন, ‘বাণিজ্য সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ছুটির দিনে। কেন এটা করতে হলো? ঈদের ছুটির মধ্যে কি এমন কোনো কাজ আটকে ছিল যে সচিব নিয়োগ না দিয়ে করা যাচ্ছিল না?’
তিনি বলেন, ‘প্রশাসনে এসব চর্চা পুরোনো দিনের অভ্যাসেরই প্রতিফলন। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা একটি সরকারকে বিতর্কিত করতে মধ্যম পর্যায়ের কিছু অফিসারের হস্তক্ষেপে এসব হচ্ছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এদের নিয়ন্ত্রণ না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’
