মিরপুর শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ঝা চকচকে করিডোরগুলো ব্যস্ত থাকার কথা ক্রিকেট খেলা, উদযাপন আর ঠিকঠাকভাবে বোর্ড চালানোর জন্য। সেখানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আবারও এমন এক নির্বাচন উপহার দিল, যা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে বরং নিয়ম রক্ষার আড়ালে এক রাজ্যাভিষেক বলেই বেশি মনে হয়।
সাবেক বাংলাদেশ অধিনায়ক তামিম ইকবাল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিসিবির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। কারণ, তার মনোনয়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো কোনো প্রার্থীই সামনে আসেননি। কাগজে-কলমে এটিকে একটি সুন্দর সমঝোতা হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে এটি দেশের ক্রিকেট পাড়ায় একটি পুরোনো ও অস্বস্তিকর প্রশ্নকেই সামনে এনেছে—এই প্রক্রিয়ার কতটুকুই বা আসলে সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল?
বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রশাসনে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ শব্দটির অর্থ খুব কম সময়ই একতা বোঝায়; বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর মানে দাঁড়ায়, ব্যালট পেপার জমা পড়ার অনেক আগেই আসলে ফলাফল ছিলো নির্ধারিত, সেখানে নির্বাচন কেবল একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।
অ্যাডহক কমিটির প্রধান থেকে নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে তামিমের এই আসাটাকে নেতৃত্বের একটি স্বাভাবিক বদল হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনটিকে কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া না বলে, ক্ষমতার এমন এক মেলবন্ধন বা হাতবদল বলাই ভালো, যা নির্বাচনের দিনটির অনেক আগেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল।
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু তার বদলে, তারা এমন একটি ২৫ সদস্যের বোর্ড তৈরি করল, যার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসেছেন আগে থেকেই এই প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যক্তিরা। নিয়ম মেনে সব করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই প্রশ্ন থেকেই যায়—ক্ষমতা যখন একটা নির্দিষ্ট মহলে আটকে থাকে, তখন শুধু নিয়ম দিয়ে কি আদৌ নিরপেক্ষতা আনা সম্ভব?
আর ঠিক এই জায়গাটাতেই খটকা লাগে—প্রশ্নটা আইনি বৈধতা নিয়ে নয়, বরং এর নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে।
বিশ্লেষকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, বিসিবি এমন একটি কাঠামোতে চলে যেখানে নিয়মকানুনের চেয়ে ক্ষমতার প্রভাব বেশি কাজ করে। এবারের নির্বাচন সেই ধারণাকেই আরও সত্যি প্রমাণ করল। রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা, পেছন থেকে সমর্থন আর পর্দার আড়ালের আঁতাতের চেনা অভিযোগগুলো আবারও সামনে চলে এসেছে, যা কোনো গোপন গুঞ্জন নয় বরং একটি চিরচেনা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কাউন্সিলর ও বোর্ডের সদস্যদের তালিকা খুঁটিয়ে দেখলে সেই উদ্বেগের কারণ আরও স্পষ্ট হয়। গণমাধ্যমে আসা খবর অনুযায়ী, নির্বাচিত বেশ কয়েকজন পরিচালক তাদের পারিবারিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের কারণে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও রাষ্ট্রীয় মহলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
ক্লাব ক্যাটাগরিতে ইসরাফিল খসরু এবং সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ প্রত্যেকে সর্বোচ্চ ৭২টি করে ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তারা দুজনেই আগের অ্যাডহক কমিটিতে ছিলেন। এক্সিয়াম ক্রিকেটার্সের কাউন্সিলর ইসরাফিল হলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে, আর ফিয়ার ফাইটার্স ক্লাবের ইব্রাহিম হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ছেলে।
আরেকটি বড় নাম আসিফ রব্বানি, যিনি ৬৪টি ভোট পেয়েছেন। তিনি বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের ছেলে। নির্বাচিত হওয়া ইয়াসির আব্বাস হলেন ঢাকা-১০ আসনের এমপি ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাসের ছেলে। এ ছাড়া ব্যবসায়ী সাকিব আহমেদ সালাম এবং সরকারপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাব-এর সঙ্গে যুক্ত সরকার মাহবুব হোসেন শামীম বোর্ডে আসায় এটি ব্যবসা, রাজনীতি ও সাংগঠনিক মহলের এক বড় মিশেলে পরিণত হয়েছে।
জেলা ও বিভাগীয় ক্যাটাগরিতেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একই চিত্র দেখা গেছে। খুলনায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের হারিয়ে জিতেছেন বিএনপি নেতা শফিকুল আলম এবং যশোরের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের ভাই শান্তনু ইসলাম। ঢাকায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাতের ছেলে সায়েদ বিন জামান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পদ পেয়েছেন।
চট্টগ্রাম থেকে পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরীর চাচা, লক্ষ্মীপুরের মইন উদ্দিন চৌধুরী পরিচালক হয়েছেন। রংপুরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভাই মির্জা ফয়সাল আমিনও পরিচালক পদ পেয়েছেন। রাজশাহী থেকে বোর্ডের সদস্য হয়েছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ছেলে মীর শাখরুল আলম। আর সিলেটের সাবেক বিসিবি পরিচালক ও বর্তমান সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী আবারও বোর্ডে ফিরে এসেছেন।
আলাদা আলাদাভাবে দেখলে এই সম্পর্কগুলোকে হয়তো সাধারণ ব্যবসা বা ক্রীড়া প্রশাসনের অংশ মনে হতে পারে। কিন্তু সব কটি নাম একসঙ্গে মেলালে এই ধারণাই সত্যি হয় যে—ক্রিকেট বোর্ডে জায়গা পেতে ক্রিকেটীয় যোগ্যতা বা প্রশাসনিক দক্ষতার চেয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকাটাই বেশি কাজে দেয়।
আসল বিতর্কটা কিন্তু এখানে নয় যে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ক্রীড়া প্রশাসনে আসতে পারবেন কি না। প্রশ্নটা হলো, যাদের এমন কোনো ক্ষমতা বা চেনা নেটওয়ার্ক নেই, এই ব্যবস্থা কি তাদের জন্যও সমান সুযোগ তৈরি করে দেয়?
তামিম এখন এই পুরো ব্যবস্থার শীর্ষে বসেছেন। তার সঙ্গে একদিকে যেমন রয়েছে জাতীয় ক্রিকেট তারকা হিসেবে দেশের মানুষের আস্থা, তেমনি অন্যদিকে রয়েছে এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে টেনে নেওয়ার বড় দায়িত্ব—যা বারবার ক্রিকেটপ্রেমীদের এটা বোঝাতে ব্যর্থ হচ্ছে যে এর ভেতরের ফলাফলগুলো আগে থেকে ঠিক করে রাখা নয়।
তাই দিনশেষে সেই অমোঘ প্রশ্নটি থেকেই যায়—এটি কি আসলেই একটি নির্বাচিত নেতৃত্ব, নাকি একটি প্রতিষ্ঠান কেবল নিজের প্রতিচ্ছবিকেই আয়নায় দেখছে আর তাকেই গণতন্ত্র বলে দাবি করছে?
