সম্প্রতি বারবার খবরে আসছে ভারতীয় পর্যটকদের নাম। যেন দুই দিন পরপরই দেশটির পর্যটকরা নানা কারণে ‘ভাইরাল’ হচ্ছেন।
ভারতের গণমাধ্যমে এ ধরনের তিনটি বড় ঘটনার বর্ণনা এসেছে। পাশাপাশি আরও ছোটখাটো কিছু ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। সংবাদ বিশ্লেষকরা এসব ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে এক নজিরবিহীন দৃশ্য। ভিয়েতনামের এক বিমানবন্দরে থেমে থাকা উড়োজাহাজের সামনে এক দল ভারতীয় পর্যটককে ‘গার্বা’ নাচে অংশ নিতে দেখা যায়। ‘গার্বা’ শব্দটির বাংলা রূপ ‘গর্ভ’। দুর্গা দেবীর প্রতিমার সামনে এ ধরনের নাচ পরিবেশনের রীতি প্রচলিত।
তবে খুব বেশিক্ষণ এই নাচ চলেনি—বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা এসে তাদের থামিয়ে দেন। বিমানবন্দরের টারম্যাককে ‘বিধিনিষেধের আওতাধীন’ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উড়োজাহাজ থেকে নেমে বাসে করে বা পায়ে হেঁটে বিমানবন্দরে ঢুকে পড়াই ভব্য আচরণ।
সেখানে নাচে অংশগ্রহণ অপরাধ না হলেও কোনো বিমানবন্দরই এ ধরনের আচরণ মেনে নেয় না।
সমাজমাধ্যমে একজন এই অনাকাঙ্ক্ষিত নাচের ভিডিওটি শেয়ারের পর মন্তব্য করেন, ‘কতিপয় ভারতীয় পর্যটকের এ ধরনের আচরণের কারণে বাকি সবাই বিদেশের মাটিতে বৈষম্যের শিকার হয়।’
বিশ্ব পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের এক হোটেল চার ভারতীয় পর্যটকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছে। একটি বিলাসবহুল রিসোর্টে ধারণ করা ভিডিও সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
ভিডিওতে রিসোর্টের কর্মীদের চেকআউটের সময় ওই চার পর্যটকের ব্যাগ ঘাঁটাঘাঁটি করতে দেখা যায়।
এক পর্যায়ে হোটেল কক্ষ থেকে চুরি করে আনা বেশ কয়েকটি পণ্য মেঝের ওপর সাজিয়ে রাখতে শুরু করেন কর্মীরা। এ ঘটনায় পর্যটকরা বিব্রত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, যা ভিডিওতে স্পষ্ট হয়।
পুলিশের মুখপাত্র ইপতু ই গুস্তি নুরাহ সুয়ারদিতার বরাত দিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যম বালি টাইমস জানায়, গত ১৬ এপ্রিল চার ভারতীয় পর্যটক আসভারা রিসোর্ট উবুদ নামের বিলাসবহুল হোটেলে চেক ইন করেন। তারা দুই রাত, তিন দিনের জন্য দুটি কক্ষ বুকিং দেন।
এরপর ১৯ এপ্রিল সকালে তারা হোটেল ছেড়ে যাওয়ার সময় চুরির বিষয়টি সামনে আসে। চেকআউটের সময় হোটেল কর্মীরা লক্ষ্য করেন, কক্ষের বেশ কিছু জিনিস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
এগুলোর মধ্যে ছিল গোসল করার তোয়ালে, সুইমিং পুলের তোয়ালে, হেয়ার ড্রায়ার, জাপানি কিমোনোর মতো পোশাক, পাপোশ, টিভি রিমোট বক্স ও রিসোর্টের ছুরি-চামচ।
কর্মীরা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানান।
পরে পর্যটকদের ব্যাগ তল্লাশি করে খোয়া যাওয়া সবগুলো পণ্যই খুঁজে পাওয়া যায়।
পর্যটকরা ‘চুরি’ করা পণ্য ফিরিয়ে দিলে হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
থাইল্যান্ডের অন্যতম মূল পর্যটন আকর্ষণ ফুকেট এলাকার ইয়োনা বিচ ক্লাব বেশ জনপ্রিয়। ক্লাবের ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে, এটাই ‘বিশ্বের প্রথম ভাসমান বিচ ক্লাব’।
ফুকেটের উপকূলে নোঙর করে রাখা একটি বড় নৌযানে বহুতল বিশিষ্ট এই বিচ ক্লাবটি চালু করা হয়। এতে আছে ইনফিনিটি পুল, বার ও রেস্তোরাঁ। দর্শনার্থীরা নৌকায় করে সেখানে পৌঁছাতে পারেন।
এই ক্লাবের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো নির্বিঘ্নে আন্দামান সাগরের দিকে তাকিয়ে নাচ-গান-জলকেলি-খাওয়া ও পানের সুযোগ।
সম্প্রতি এক ভারতীয় নাগরিক সমাজমাধ্যমে ওই বিচ ক্লাবের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের দাবি তোলেন।
গোয়ার ডিজে-শিল্পী জোনাস মন্টেইরো ইনস্টাগ্রামে দাবি করেন, তিনি ও বেশ কয়েকজন ভারতীয় পর্যটক ইয়োনা ক্লাবে প্রবেশের জন্য টিকিট কেটেছিলেন।
সঠিক সময়ে ক্লাবে উপস্থিত হওয়ার পরও নানা অজুহাত দেখিয়ে তাদের সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
তার দাবি, শুধু ভারতীয় নাগরিক হওয়ার কারণেই তাকে ও তার সঙ্গীদের সেই ক্লাবে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
তবে পরবর্তীতে সমাজমাধ্যমে ইউজারদের মন্তব্যে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ভারতের গণমাধ্যম এনডিটিভি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
এক ইউজার জানান—আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয়দের ওই ক্লাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি। তবে অতীতে ভারতীয়দের নানা ‘অপকর্মের’ কারণে ক্লাব কর্তৃপক্ষ এমন ব্যবস্থা নিয়েছে।
অপর এক ইউজার লিখেন, ‘আগে ইয়োনা বিচ ক্লাবে সব দেশের নাগরিকদের স্বাগত জানানো হতো। কিন্তু উন্মত্ত জলোচ্ছ্বাসের মতো ভারতীয়রা আসতে শুরু করার পর ঘটনাপ্রবাহ বদলে যায়। তারা দেরি করে আসেন, সর্বোচ্চ ভলিউমে বলিউডের গান বাজাতে থাকেন, ইনফিনিটি পুলে বারবার ঝাঁপিয়ে পড়েন, সেখানে চায়ের কাপ ও খাবারের উচ্ছিষ্ট ছড়াতে শুরু করেন, সরোজিনীনগর কায়দায় প্রবেশপথে ধাক্কাধাক্কি করে ঢুকতে থাকেন, পোশাকবিধি মানেন না এবং দুই মিনিট পর পর গ্রুপ সেলফি তুলে সবার বিরক্তির কারণ হন।’
এ বিষয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বৈষম্যের অভিযোগ উড়িয়ে দেয়। তাদের দাবি, ওই ভারতীয় শিল্পী ও তার সঙ্গীরা নিয়ম মানেননি বলেই তাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তাদের ক্লাবে নারী পুরুষের ভারসাম্য মেনে চলা হয়। বছরের সময়ভেদে এই অনুপাত বদলায়।
হোটেলের দাবি, ওই দলটিতে মাত্র একজন নারী ও বেশ কয়েকজন পুরুষ থাকায় তাদেরকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
তবে তাদের টিকিটের মূল্য ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানায় ইয়োনার প্রতিনিধিরা।
বিশ্লেষকরা ভারতীয় পর্যটকদের এসব আচরণের পেছনে চারটি মূল কারণ দেখতে পারছেন। এগুলো হলো—
ভাইরাল মিডিয়ার প্রতি পক্ষপাত
ভ্রমণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি
বিদেশি সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যা
কনটেন্ট-নির্ভর পর্যটন
সংবাদমাধ্যমে এসব কারণ একটু বিস্তারিত তুলে ধরা ধরা হয়েছে।
গত ৫ জুন টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়, আজকাল সমাজমাধ্যমে ইউজারদের মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বিচিত্র কনটেন্ট পোস্ট করা হয়। এর সঙ্গে বাস্তবতার তেমন মিল নেই। এতে ‘ভাইরাল লজিক’ ব্যবহার করা হয়। এর নেপথ্যে থাকে কনটেন্ট ভাইরাল করা।
গত ১০ মে ফরাসি গণমাধ্যম লো মোঁদ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়—টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের যুগে পর্যটনের চেহারা বদলে গেছে। ভ্রমণের ছবি, টিপস, গল্প ও বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেছে সমাজমাধ্যম। ফলে ভ্রমণ-ইচ্ছুক ব্যক্তিদের কল্পনা, অভিজ্ঞতা, ধ্যানধারণা—সবই বদলেছে। এর রয়েছে নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন—সম্প্রতি ভারতীয় পর্যটকদের লাগামছাড়া আচরণের পেছনে এ বিষয়গুলোর প্রভাব আছে।
পাশাপাশি, পর্যটক হিসেবে স্বাভাবিক আচরণের সংজ্ঞাও বদলেছে। আগে পর্যটকরা জাদুঘরে যেতেন, ভালো রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া ও সমুদ্রতটে বসে সময় কাটাতে পছন্দ করতেন।
কিন্তু এখন তারা চান ‘ভাইরাল কাজে’ নিয়োজিত হতে। এর মধ্যে আছে হোটেল থেকে পণ্য চুরি করে আনার মতো ‘দুঃসাহসিক’, কিংবা টারম্যাকে ধর্মীয় গানের সঙ্গে নাচানাচির মতো কাজ।
সবচেয়ে সহজবোধ্য কারণ সম্ভবত এটাই। তিন কোটি ভারতীয় পর্যটকের মধ্যে এক শতাংশও যদি ‘উদ্ভট’ আচরণ করেন, তাহলেও তিন লাখ ‘ভাইরাল ঘটনা’ সংবাদমাধ্যমে চলে আসতে পারে।
গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে অবিশ্বাস্য হারে বেড়েছে ভারতীয় পর্যটকের সংখ্যা। এমন কোনো দেশ নেই যেখানে গিয়ে দুই-তিন দিন কাটালে অন্তত একবারও আপনার কানে হিন্দি ভাষা বা বলিউডের গান পৌঁছাবে না।
অন্য অনেক দেশের মতো ভারতের নাগরিকরাও তাদের নিজ দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্বিত। তারা চায় ওই সংস্কৃতিকে সব জায়গায় বহন করে নিতে।
তবে অনেক দেশের সংস্কৃতি, আইন ও প্রচলিত রীতির সঙ্গে ভারতের আকাশ-পাতাল পার্থক্য। ফলে ভিন্ন সংস্কৃতির দেশগুলোয় গিয়ে নিজের অজান্তেই তারা আইন অমান্য করে বসেন।
কনসার্টে হঠাৎ সিগারেট খেতে শুরু করা, অহেতুক গোলযোগ, সুইমিং পুলে নিজেদের পছন্দের গান জোরে শুনতে থাকা, অন্যদের শান্তি বিনষ্ট করে দুই মিনিট পর পর গ্রুপ সেলফি তোলা—এ ধরনের কাজগুলো ভারতে গ্রহণযোগ্য হলেও থাইল্যান্ড বা ভিয়েতনামে অতটা স্বাভাবিক নয়।
ভারতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চগেটের এক প্রতিবেদন অনুসারে—ইদানীং ভারতের পর্যটকরা ভ্রমণে গিয়ে সময়টা উপভোগ করার তুলনায় ‘কনটেন্ট’ তৈরিতে বেশি মনোযোগ দেন।
গত এপ্রিলে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়—এর পেছনে ইন্টারনেটের ভূমিকা অনেক।
ফোমো বা ফিয়ার অব মিসিং আউট-এ ভোগার আশঙ্কায় পর্যটকরা নানা ধরনের কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েন। এর অর্থ—‘অন্যেরা যা করেছে, তা আমাকেও করতে হবে’।
আবার অনেকে ইনফ্লুয়েন্সারদের অনুকরণ করতে গিয়েও ‘অদ্ভুত’ আচরণ করে বসেন।
গবেষকদের ভাষ্য—পর্যটকরা ভাইরাল কনটেন্টের অনুকরণ করে নিজেরা কনটেন্ট তৈরি করতে খুবই ভালোবাসেন। বিশেষ করে, জেন জি প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
অনেকে এ ধরনের ভ্রমণকে ‘কনটেন্ট ফার্স্ট ট্রাভেল’ আখ্যা দিয়েছেন। অর্থাৎ, পর্যটনের জন্য ভ্রমণ না করে কনটেন্ট তৈরি করাকেই এসব পর্যটক বেশি গুরুত্ব দেন।
ভারতীয় পর্যটকদের মধ্যে যেসব প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তা বাংলাদেশসহ অনেক দেশের পর্যটকদের মধ্যেও দেখা যায়। দিনে দিনে ‘জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন দেশে যাওয়ার’ বদলে ‘ভাইরাল কনটেন্ট তৈরির জন্য চীনে যাওয়া’র মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন পর্যটকরা।
ফলে প্রতিনিয়তই বাড়ছে আচরণগত সমস্যার অভিযোগ। অল্প সংখ্যক পর্যটকের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কারণে লজ্জায় পড়তে হচ্ছে গোটা জাতিকে। অনেক দেশ কূটনৈতিক জটিলতাতেও পড়ছে।
মজার বিষয় হলো—অনেক নেটিজেন ভারতীয় পর্যটকদের এসব আচরণকে খুব গুরুতর ভাবতে নারাজ। তাদের যুক্তি, ‘তারা কোনো অপরাধ করেনি’।
তাদের মতে, হোটেলের পণ্য চুরির বিষয়টি বাদ দিলে বাকি দুইটি ঘটনা তেমন গুরুতর নয়।
কেউ কেউ বলছেন—টিকটক-ইনস্টাগ্রামের যুগে পর্যটকদের আচরণের সঙ্গে পর্যটনবান্ধব দেশগুলোকে মানিয়ে নিতে হবে। পর্যটকদের মন-মানসিকতা বদলানোর চেষ্টা বৃথা।
