মঞ্চে উঠলেন লিওনেল মেসি। গোল্ডেন বল তুলে দেওয়া হলো তার হাতে। সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। এর আগেও পেয়েছেন, ২০১৪ সালে। কিন্তু সেই নেওয়াটা আর এই নেওয়াটা এক নয়। একটা পুরস্কার নিতে মানুষ যেভাবে হাঁটে, আর জীবনের সবচেয়ে বড় রাতে মঞ্চে ওঠার হাঁটা, দুটো আলাদা।
পুরস্কারটা হাতে নিলেন। ঘুরলেন। এবং তখন চোখ পড়ল সামনে রাখা ট্রফিটার দিকে। সেই ট্রফি। সোনার, ঝকঝকে, এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি বস্তু। আনুষ্ঠানিকভাবে হাতে তুলে দেওয়া হবে একটু পরেই। মাত্র কয়েক মিনিটের অপেক্ষা। কিন্তু সেই কয়েক মিনিটও সইল না।
ঝুঁকলেন মেসি। আলতো করে ছুঁলেন। একটি চুমু। তারপর আরেকটি।
দুটো।
এই দুটো চুমু বুঝতে হলে আট বছর পেছনে যেতে হবে।
২০১৪ সাল। ব্রাজিল। বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে গেছে আর্জেন্টিনা। মেসি তখনো মঞ্চে। হাতে গোল্ডেন বল, সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। ঠিক সামনেই বিশ্বকাপ ট্রফি।
এতটুকু দূরত্ব।
কিন্তু সেবার সেটা ছোঁয়া যায়নি। নিয়ম আছে। বিজয়ী ছাড়া কেউ ট্রফি স্পর্শ করতে পারে না। মেসি তাকিয়ে থাকলেন, হয়তো মনে মনে একবার ছুঁতে চাইলেন, কিন্তু হাত বাড়াননি।
সেই রাতের ছবিটা এখনো অনেকের মনে আছে। গোল্ডেন বল হাতে, শূন্য চোখে মঞ্চ ছাড়ছেন মেসি। পুরস্কারটার দিকে তাকানোর তাগিদও নেই। কারণ যেটা চেয়েছিলেন সেটা পাননি, আর যেটা পেয়েছেন সেটা সেই মুহূর্তে কেবলই একটা ধাতব বস্তু।
সেই রাতে মেসি কী ভেবেছিলেন, কেউ জানে না। কিন্তু আট বছর পর, লুসাইলের মঞ্চে দাঁড়িয়ে, ট্রফিটার দিকে ঝুঁকতে ঝুঁকতে হয়তো সেই রাতের কথাই মনে পড়েছিল।
এই মঞ্চেই, মেসি আসার আগে, আর্জেন্টিনার আরও দুজন এসেছিলেন।
এঞ্জো ফার্নান্দেজ। একুশ বছর বয়সী ছেলে, সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার নিয়ে ঠিক এই পথ দিয়ে গেলেন। সামনে ট্রফি। তাকালেন। লোভ হলো কি না জানা নেই। কিন্তু থামলেন না। ছুঁলেন না।
এমিলিয়ানো মার্তিনেজ এলেন সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার নিয়ে। সারা টুর্নামেন্ট দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, পেনাল্টি শুটআউটে রাতটা বদলে দিয়েছিলেন। তাঁরও একবার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়নি, এমন নয়। কিন্তু সামলে নিলেন।
দুজনেই হয়তো মনে মনে জানতেন, এই ট্রফি যার, সে আসুক। সেই প্রথম স্পর্শ করুক।
তারপর এলেন মেসি। এবং এবার আর সংযম কাজ করেনি। দুটো চুমু।
ঠিক এই মুহূর্তে একটু থামা দরকার।
কারণ এই দুটো চুমু শুধু একটা আবেগের মুহূর্ত নয়। এর পেছনে আছে একটা মানুষের পুরো জীবন। আছে রোজারিওর মাটি, বার্সেলোনার করিডোর, চারটি ভাঙা বিশ্বকাপের স্বপ্ন, একটা অবসর ঘোষণা এবং তারপর ফিরে আসার গল্প। সেটা না জানলে এই চুমুর ওজন বোঝা যাবে না।
১৯৮৭ সাল। রোজারিও। পারানা নদীর ধারের সেই শহরে জন্মাল একটি ছেলে। পাড়ার মাঠে বল পায়ে দিলে থামানো যেত না। রাস্তার কোণে, স্কুলের উঠোনে, যেখানেই সুযোগ, সেখানেই সে। কিন্তু শরীর সায় দিচ্ছিল না। এগারো বছর বয়সে ধরা পড়ল গ্রোথ হরমোন ডেফিশিয়েন্সি। শরীর বাড়ছে না স্বাভাবিকভাবে। চিকিৎসা আছে, কিন্তু মাসে প্রায় নয়শো ডলার। মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। আর্জেন্টিনার ক্লাবগুলো ঝুঁকি নিতে রাজি হয়নি।
তারপর বার্সেলোনা। একটা ন্যাপকিনে চুক্তি। চিকিৎসার খরচ আমরা দেব। শুধু আসো।
সেই ছেলে গেলেন। এবং গেলেন বলেই পৃথিবী আজ তাকে চেনে।
বার্সেলোনায় বড় হতে হতে মেসি হয়ে উঠলেন এক অলৌকিক সত্তা।
ফুটবল মাঠে তিনি যা কিছু স্পর্শ করেছেন, প্রায় সবকিছুই সোনায় পরিণত হয়েছে। স্পেনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক যুগের প্রতীক। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের জন্য তিনি ছিলেন দুঃস্বপ্ন, দর্শকদের জন্য বিস্ময়, আর সতীর্থদের জন্য আশীর্বাদ।
প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন রেকর্ড ভাঙছিলেন তিনি। এক মৌসুমে অবিশ্বাস্য সংখ্যক গোল, একের পর এক ব্যালন ডি’অর, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা, লা লিগার আধিপত্য—ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল ব্যক্তিগত অধ্যায়গুলোর অনেকগুলোই তাঁর নামে লেখা হচ্ছিল।
তবুও কোথাও যেন একটি শূন্যস্থান রয়ে যাচ্ছিল। যেন পৃথিবীর একাংশ তাঁর দিকে তাকিয়ে বলছে, ‘সব ঠিক আছে, কিন্তু বিশ্বকাপ কোথায়?’
কিন্তু নীল-গারানা জার্সি ছেড়ে নীল-সাদা জার্সি পরলেই একটা অদৃশ্য ভার এসে চাপত কাঁধে।
কারণ ওই প্রশ্ন সবসময় তৈরি ছিল। অপেক্ষা করছিল। সুযোগ পেলেই ছুঁড়ে দেওয়া হতো।
২০০৬। ২০১০। ২০১৪। ২০১৮।
চারটি বিশ্বকাপ। চারটি আলাদা যন্ত্রণা।
২০১৪ সালে তো একেবারে দোরগোড়া পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। ফাইনাল মাঠে জার্মানির কাছে হার। সেই সন্ধ্যায় পুরস্কার মঞ্চে দাঁড়িয়ে গোল্ডেন বল হাতে নেওয়া মেসির মুখটা এখনো স্পষ্ট মনে আছে অনেকের। চোয়াল শক্ত, চোখ শূন্য, হাত যান্ত্রিকভাবে পুরস্কারটা ধরে আছে, যেন শরীর সেখানে আছে কিন্তু সত্তা আর নেই।
সেই মুখ আজ কোথায়?
কাতারের মাটিতে, লুসাইল স্টেডিয়ামের আলোর নিচে, ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে ইতিহাস একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়েছিল। এ লড়াই ছিল একটা মানুষের সারাজীবনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা সময়ের পরীক্ষা।
ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই মহারণে নাটক ছিল, ভয় ছিল, বিস্ময় ছিল, পুনর্জন্ম ছিল। কখনো মনে হচ্ছিল আর্জেন্টিনা জিতে গেছে। আবার মুহূর্তেই মনে হচ্ছিল সব হারিয়ে গেছে। ম্যাচের প্রতিটি মিনিট যেন কয়েক বছরের সমান দীর্ঘ।
আর সেই দীর্ঘ যন্ত্রণার শেষে এল পেনাল্টি শুটআউট। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছিল।
তারপর। একটি সেভ। আরেকটি সফল শট। আর শেষ বাঁশি। শেষ। অবশেষে শেষ। ৩৬ বছরের অপেক্ষা শেষ। মেসির দীর্ঘতম অপেক্ষারও সমাপ্তি।
তিনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। চোখ ভিজে উঠল। সতীর্থরা দৌড়ে এলেন। স্টেডিয়াম গর্জে উঠল। পৃথিবীর কোটি মানুষের উল্লাস যেন একসঙ্গে আকাশে বিস্ফোরিত হলো।
আর কিছুক্ষণ পর সেই মুহূর্ত। যে মুহূর্তের জন্য এক জীবন অপেক্ষা করেছে। দুই হাতে তুলে নেওয়া হলো বিশ্বকাপ ট্রফি। সোনালি আলো ঝলসে উঠল চারপাশে।
কিন্তু এই পূর্ণতার গল্পটা শুধু একটা ফাইনালের গল্প নয়।
মেসিকে নিয়ে একটা অভিযোগ বহু বছর ধরে চলে এসেছে। বার্সেলোনার জার্সিতে যা করেন, আর্জেন্টিনার জার্সিতে তা করেন না। দেশের হয়ে বড় মঞ্চে ব্যর্থ। এই কথাটা কতটা ন্যায্য ছিল, সেই বিতর্ক থাকুক, কিন্তু কথাটা যে মেসির ভেতরে গেঁথেছিল, সেটা বোঝা যেত। কোপা আমেরিকা জেতার পর তাঁর প্রতিক্রিয়া দেখলেই বোঝা যায়। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। একজন মানুষ, যিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন শুধু নিজেকে না, পুরো একটা ইতিহাসকে।
বিশ্বকাপ ছিল সেই প্রমাণের শেষ টুকরো।
ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরার মুহূর্তে স্টেডিয়ামে যে আওয়াজ উঠেছিল, সেটা কোনো গ্যালারির চিৎকার ছিল না। সেটা ছিল তিন দশকের একটা প্রজন্মের সমস্ত আবেগের বিস্ফোরণ। সেই রাতে আর্জেন্টিনার বুয়েনোস আইরেসের রাস্তায় মানুষ নেমেছিল লক্ষে লক্ষ। ঢাকায়ও নেমেছিল। যে শহরেই আর্জেন্টিনার একটা নীল-সাদা পতাকা উড়েছে, সেখানেই সেই রাতটা উৎসবে পরিণত হয়েছিল।
কারণ মেসির বিশ্বকাপ জেতা শুধু আর্জেন্টিনার গল্প নয়। এটা প্রতিটি মানুষের গল্প, যে কখনো স্বপ্ন দেখেছে এবং অপেক্ষা করেছে।
বিশ্বকাপ তার একটি চুম্বনের অপেক্ষায় ছিল। অবশেষে সেটা পৌঁছে দেওয়া গেল।
