নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ পাওয়ার আগ পর্যন্ত স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। এর পর মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে নগদ অর্থসংকটে পড়েছে ব্যাংকটি।
গ্রাহকদের আমানত তুলে নেওয়ার ব্যাপক চাপের মুখে গতকাল ব্যাংকটির পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক বসিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে তার আগেই ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতির বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেছে।
এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাপক ঋণ অনিয়ম ও আর্থিক অনিয়মের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। কিন্তু গ্রাহকদের টাকা তুলে নেওয়ার হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকটি এখন নতুন করে চাপে পড়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ৩১ মে পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে থাকা ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবের স্থিতি ইতিবাচক ছিল। কিন্তু গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তা প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ঘাটতিতে পড়েছে।
বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে এই চলতি হিসাব সংরক্ষণ করে। এটি মূলত আন্তব্যাংক লেনদেন নিষ্পত্তির মাধ্যম হিসেবে কাজ করে এবং ব্যাংককে তাদের দৈনন্দিন দায় মেটাতে সাহায্য করে। এই হিসাবের স্থিতি ঋণাত্মক বা ঘাটতিতে পড়লে ব্যাংকগুলোর তহবিল স্থানান্তর ও লেনদেন নিষ্পত্তিতে সমস্যা হয়। এর ফলে গ্রাহকসেবা ব্যাহত হতে পারে।
ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. আলতাফ হোসেনও এই চাপের কথা স্বীকার করেছেন। গতকাল তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভরতার কারণেই এই ঘাটতি বেড়েছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা পাওয়ার পর তহবিল স্থানান্তরসহ অন্যান্য লেনদেন সেবা পুনরায় চালু হয়েছে বলে জানান তিনি।
ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরও জানান, গ্রাহকেরা গড়ে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার কোটি টাকা তুলে নিচ্ছেন। জমাও পড়ছে প্রায় একই পরিমাণ টাকা। তবে টাকা তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা ব্যাংকটিকে চাপে ফেলেছে। এ কারণে শাখা পর্যায়ে প্রতি গ্রাহকের জন্য নগদ টাকা তোলার সীমা ৫০ হাজার টাকা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
তবে কয়েকজন গ্রাহক জানিয়েছেন, চলমান এই চাপের মুখে ঢাকার শাখাগুলো থেকে মাত্র ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত তোলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
তীব্র নগদ অর্থসংকট মোকাবিলায় দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংকটিকে গতকাল ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
চলতি মাসের শুরু থেকেই গ্রাহকদের টাকা তুলে নেওয়ার ব্যাপক চাপের কারণে ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সিআরআর (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও) সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মে ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা, যা ৭ জুন কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৮০ হাজার ১৪১ কোটি টাকায়। এই চাপের মুখে গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা চায় ব্যাংকটি।
গত ১২ জুন বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকটিকে সহায়তা দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছিলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের সংকট শিগগিরই কেটে যাবে। আমানতকারীদের টাকা তুলতে কোনো অসুবিধা হবে না। প্রয়োজনে জরুরি তারল্য সহায়তা দেওয়া হবে।’
পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে গত রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে দেখা করে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পর্ষদ।
বৈঠক শেষে মো. আলতাফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরুরি সহায়তার পর ব্যাংকের ব্যবসা ও তারল্য ব্যবস্থাপনার বিষয়েই মূল আলোচনা হয়েছে। তিনি জানান, টাকা তোলার ধরন, খাতভিত্তিক চাহিদা এবং আগামী দিনগুলোর সম্ভাব্য তারল্য চাহিদার ওপর ভিত্তি করে নতুন পাওয়া এই তহবিল ব্যবহার করা হবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষজ্ঞ দল ব্যাংকটির যাবতীয় তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখবে বলেও জানান তিনি।
যেভাবে অস্থিরতা শুরু
দেশ যখন ঈদের এক সপ্তাহের লম্বা ছুটির প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সেই সময় গত ২৪ মে আগের চেয়ারম্যানের পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আকস্মিক এই নিয়োগে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ তৈরি হয়।
ঈদের ছুটির পর গত ১ জুন ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’–এর ব্যানারে একদল মানুষ ঢাকার মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন। ছুটির পর প্রথম কর্মদিবসে শত শত লোক সেখানে জড়ো হয়ে এই নিয়োগ বাতিল এবং ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহালের দাবি জানান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই বিক্ষোভের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছিলেন, খুরশীদ আলম তাদের একজন।
সচেতন গ্রাহক ফোরাম নতুন চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিতে তাদের বিক্ষোভ অব্যাহত রাখে।
এই আন্দোলনকারীদের প্রতি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন এবং দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের বক্তব্য থেকে এই নিয়োগের ব্যাপারে তাদের জোরালো আপত্তির বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে গত সাধারণ নির্বাচনে ইসলামী ব্যাংকের ভূমিকা নিয়েও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দেখা গেছে। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকটি জামায়াতকে সুবিধা দিয়েছে। তবে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে ওই বক্তব্য সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান।
১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে ইসলামী এই দলটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি ইসলামী ব্যাংকের। এর পরিমাণ ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫০ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
২০১৭ সালে বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। ব্যাংকিং খাতে বহুল চর্চিত অভিযোগ হলো, গ্রুপটি পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশই নিজেদের এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কোম্পানির নামে বের করে নেয়। গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটিকে ওই গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা হয়। এত দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকিতে গঠিত স্বতন্ত্র পরিচালকদের একটি পর্ষদের অধীনে এটি পরিচালিত হচ্ছিল।
ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন বলেন, ‘খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত এবং তা আদায়ের হার খুবই কম।’
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকটি অন্য গ্রহীতাদের কাছ থেকেও ঋণ আদায়ের চেষ্টা করছে। তবে নিয়মিত গ্রাহকেরাও ঋণ পরিশোধে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন, যে কারণে এ ক্ষেত্রেও অগ্রগতি বেশ ধীর।
