সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্সের মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত, ফলাফলে হস্তক্ষেপের অভিযোগ

সিঅ্যান্ডএফ (ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং) এজেন্ট লাইসেন্সের মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশের একদিন পরই তা স্থগিত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, লিখিত পরীক্ষার ফলাফলে অনৈতিক হস্তক্ষেপের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় শুরু থেকেই পরীক্ষা প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার এনবিআরের কাস্টমস মামলা ও বিরোধ নিষ্পত্তি শাখা থেকে ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে মৌখিক পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে স্থগিতাদেশের সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি।

আমদানি-রপ্তানি, পণ্য খালাস ও জাহাজিকরণ কার্যক্রমে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা কাস্টমসের অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন।

কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা-২০২৬ অনুযায়ী, লাইসেন্স দেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, আবেদন যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা গ্রহণ ও লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্ব কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট ট্রেনিং একাডেমির (সিইভিটিএ) ওপর ন্যস্ত।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, বিধিমালায় এনবিআরের পক্ষ থেকে পরীক্ষা স্থগিত করার কোনো বিধান নেই।

পরীক্ষা আয়োজক কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ মে অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য বিবেচিত ২ হাজার ৯৮৭ জন আবেদনকারীর মধ্যে ২ হাজার ৫২১ জন অংশ নেন। ৮০ নম্বরের পরীক্ষায় ৪০ বা তার বেশি নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন ২১০ জন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরীক্ষা কমিটির এক সদস্য দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘লিখিত পরীক্ষার রাতেই উত্তীর্ণ ২১০ জনের তালিকাসহ প্রতিবেদন তৈরি করে কমিটির ছয় সদস্য সই করেন। বিধি অনুযায়ী পরদিনই ফল প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক চাপের কথা বলে এনবিআরের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা ১১০ জনের একটি আলাদা তালিকা দিয়ে তাদের উত্তীর্ণ করার অনুরোধ করেন। ওই তালিকা মানা না হলে প্রায় ১৫ দিন লিখিত পরীক্ষার ফল আটকে রাখা হয়।’

তার দাবি, ‘বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর গত ১ জুন কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে ২১০ জন উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীর ফলাফল প্রকাশ করে।’

তিনি বলেন, ‘বিধিমালা অনুযায়ী ২৪ জুনের মধ্যে মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ না করার জন্যও বিভিন্ন পর্যায় থেকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। সেই চাপ উপেক্ষা করে সিইভিটিএ গত ১৭ জুন মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করে। কিন্তু পরদিনই এনবিআর থেকে পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশ আসে।’

পরীক্ষা কমিটির আরেক সদস্য অভিযোগ করেন, ‘২১০ জনের তালিকার বাইরে আরও শতাধিক পরীক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ দেখানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কমিটির সদস্যরা এতে রাজি না হওয়ায় প্রথমে লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশে বিলম্ব করা হয় এবং পরে মৌখিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। আইন অনুযায়ী পরীক্ষা গ্রহণ ও লাইসেন্স প্রদানের দায়িত্ব সিইভিটিএর। ফলাফলে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ এনবিআরের নেই।’

সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা অনুযায়ী, প্রথমবারের মতো গত এপ্রিলে এ পরীক্ষার আয়োজন করে এনবিআর-অধীনস্থ সংস্থা সিইভিটিএ। আবেদন যাচাই-বাছাই, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষা পরিচালনা ও ফল প্রকাশের জন্য ছয় সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়।

পরীক্ষা কমিটির সদস্যদের দাবি, এনবিআরের পক্ষ থেকে পাঠানো তালিকায় এমন পরীক্ষার্থীর নামও ছিল, যারা লিখিত পরীক্ষায় ১০ নম্বরেরও কম পেয়েছেন। তাদের অন্তর্ভুক্ত না করায় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন তারা। একইসঙ্গে পরীক্ষা স্থগিতের প্রকৃত কারণ প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

যোগাযোগ করা হলে সিইভিটিএ মহাপরিচালক ম সফিউজ্জামান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বিধিমালা অনুযায়ী দুই মাসের মধ্যে পরীক্ষা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা। আমরা সে অনুযায়ী মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু কী কারণে তা স্থগিত করা হয়েছে, সেটি আমাদের জানানো হয়নি।’

অনৈতিক তদবিরে সাড়া না দেওয়ার কারণেই এনবিআর এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

এনবিআরের কাস্টমস মামলা ও বিরোধ নিষ্পত্তি বিভাগের দ্বিতীয় সচিব মো. শাহাদাত জামিল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কোনো সুনির্দিষ্ট কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই মৌখিক পরীক্ষা স্থগিতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

Related Articles

Latest Posts