লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রাম কয়েক দিনের ব্যবধানে যেন বদলে গেছে অচেনা এক জনপদে। কৃষিকাজ, বাজারের কোলাহল আর মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে প্রাণচাঞ্চল্য গ্রামটিতে এখন কেবল আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর নীরবতা।
শিশু নন্দিনী রানী (৭) হত্যা মামলাকে কেন্দ্র পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় পৃথক দুটি মামলায় ৩ হাজার অজ্ঞাত আসামি করা এবং পরবর্তীতে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে গ্রেপ্তার আতঙ্ক। অধিকাংশ পুরুষ আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় কার্যত পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে পুরো গ্রাম।
আজ শনিবার দুপুরে সরেজমিনে ফলিমারী গ্রামে দেখা যায়, গ্রামের প্রধান বাজার ফলিমারী বাজার প্রায় জনশূন্য। বাজারটিতে নিত্যপণ্য, কৃষি উপকরণ, পান-সুপারি, মুদি ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ২৪টি দোকান রয়েছে। কিন্তু, গত বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে বাজারের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ২৪টির মধ্যে ২২টি দোকান বন্ধ। বাকি দুটি দোকানও কয়েক ঘণ্টার বেশি খোলা থাকছে না।
বাজারের সার ব্যবসায়ী লিটন চন্দ্র রায় বলেন, ‘প্রতি বছরের মতো এবারও আমার দোকানে হালখাতার আয়োজন ছিল। প্রায় ৫ লাখ টাকা পাওনা আমার। আশা করেছিলাম অন্তত ৪ লাখ টাকা আদায় হবে। হালখাতার জন্য আপ্যায়নের ব্যবস্থাও করেছিলাম। কিন্তু সারাদিনে একজনও আসেননি। পরে বাধ্য হয়ে খাবারগুলো প্যাকেট করে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘গ্রেপ্তার এড়াতে গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ফলে বাজার, কৃষিকাজ, সামাজিক অনুষ্ঠান সবকিছুই অচল হয়ে পড়েছে।’
পানের দোকানদার সন্তোষ চন্দ্র রায় বলেন, ‘দোকান খুলে বসি, কিন্তু ক্রেতা নেই। বাজারে ভূতুড়ে পরিবেশ হয়ে গেছে। কবে যে সব স্বাভাবিক হবে, বলতে পারছি না।’
গত মঙ্গলবার জুন নন্দিনী রানী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উত্তেজিত জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও সরকারি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরদিন আদিতমারী থানায় পৃথক দুটি মামলা হয়। মামলার আসামি অজ্ঞাত ৩ হাজার ব্যক্তি। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত পুলিশ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে।
গ্রামটির প্রায় ৪০০ পরিবারের অধিকাংশই কৃষিনির্ভর। বর্তমানে বোরো ধান কাটার মৌসুম চলায় কৃষকের ব্যস্ত থাকার কথা থাকলেও পুরুষদের অনুপস্থিতিতে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
গ্রামের বাসিন্দা নিরোবালা রানী বলেন, ‘আমাদের চার বিঘা জমির ধান পেকে গেছে। দ্রুত কাটতে না পারলে ক্ষতি হয়ে যাবে। কিন্তু আমার স্বামী ও ছেলে বাড়িতে নেই। গ্রামে শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। ধানও ঘরে তুলতে পারছি না।’
তার অভিযোগ, ‘পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর কিংবা আসামির বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় গ্রামের সাধারণ মানুষ জড়িত না। বাইরে থেকে যারা এসেছিল তারাই এসব করেছে। কিন্তু এখন গ্রামের সব পুরুষকেই সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।’
একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানান মল্লিকা রানী। বলেন, ‘তিন বিঘা জমির ধান কেটে বাড়ির উঠানে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। কিন্তু মাড়াই করার লোক নেই। স্বামী বাড়িছাড়া, শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। ফসল নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি।’
ফলিমারী গ্রামের মন্দিরগুলোতে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় পূজা ও কীর্তনের আয়োজন থাকলেও গত বুধবারের পর থেকে সব বন্ধ হয়ে আছে।
স্বপ্না রানী বলেন, ‘গ্রামের চারটি মন্দিরের একটিতেও এখন পূজা-অর্চনা হচ্ছে না। কীর্তন বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রামের বেশিরভাগ পুরুষ বাড়িতে নেই। হাতে গোনা কয়েকজন আছেন, তারাই রাতে গ্রাম পাহারা দিচ্ছেন। এই অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে।’
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করে ভ্যানচালক উকিল চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘নন্দিনীর মরদেহ উদ্ধারের পর বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক মানুষ গ্রামে এসেছিল। তাদের অনেককেই আমরা চিনতাম না। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তাদেরই বেশি সক্রিয় দেখা গেছে। এখন পুরো গ্রামের মানুষ তার খেসারত দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘পুরুষশূন্য হয়ে যাওয়ায় গ্রামের অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।’
এ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ-সার্কেল) এ কে এম ফজলুল হক বলেন, ‘ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হবেন না।’
তিনি বলেন, ‘আমি নিজে ফলিমারী গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাদের আশ্বস্ত করেছি। গ্রামটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পুলিশ টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিরপরাধ গ্রামবাসীদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
নন্দিনী হত্যা মামলার তদন্ত ও পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও ফলিমারীর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং গ্রামে ফিরে আসবে স্বস্তি, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
