উত্তর আমেরিকায় বসেছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জমজমাট আসর। আর বিশ্বকাপ মানেই তো মাঠের ৯০ মিনিটের উত্তেজনার পাশাপাশি গ্যালারির নানা রঙের উন্মাদনা।
বোস্টনের পাবগুলোতে স্কটিশ সমর্থকদের হুল্লোড় থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামের বাইরে নরওয়েজিয়ানদের অভিনব দাপট—বিশ্বকাপ এবারও তার চেনা রূপ নিয়ে হাজির।
তবে এবারের আসরে গ্যালারির সুর, আবহ আর চমকে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে নরওয়ের সমর্থকদের একটি বিশেষ উদযাপন, যার নাম ‘ভাইকিং রো’।
সাধারণ ফুটবলীয় স্লোগানের গণ্ডি পেরিয়ে এটি এখন বিশ্বজুড়ে এক তুমুল জনপ্রিয় ট্রেন্ড। নরওয়ের এই ‘ভাইকিং রো’ উদ্যাপনের আদ্যোপান্ত এবং এর পেছনের হাজার বছরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হলো।
সহজ কথায়, ‘ভাইকিং রো’ হলো নিখুঁত ছন্দে দলগত শারীরিক কসরত ও স্লোগানের এক চমৎকার মেলবন্ধন। ক্রীড়া বিষয়ক গণমাধ্যম ‘গিভ মি স্পোর্টস’ জানায়, এই উদ্যাপনের মাধ্যমে মূলত প্রাচীন ভাইকিংদের বিশাল নৌকায় একযোগে দাঁড় টানার দৃশ্যটি ফুটিয়ে তোলা হয়।
এর শুরুটা হয় বেশ নাটকীয়ভাবে। মাঠে বা রাস্তায় উপস্থিত সমর্থকরা প্রথমে সবাই একসঙ্গে মাটিতে বসে পড়েন। এরপর তারা সম্মিলিত কণ্ঠে সুর করে একটি শব্দ উচ্চারণ করেন—‘রো’। নরওয়েজিয়ান ভাষায় এর অর্থ ‘দাঁড় টানা’।
স্লোগানটি মুখে বলার সঙ্গে সঙ্গেই সমর্থকরা তাদের দুই হাত এমনভাবে সামনে-পেছনে দোলাতে থাকেন, যেন তারা সত্যি সত্যিই কোনো বিশাল নৌকার দাঁড় টানছেন। ধীরে ধীরে এই দাঁড় টানার গতি বাড়তে থাকে।
তালের গতি ঠিক রাখতে ব্যাকগ্রাউন্ডে যোগ হয় ড্রামের গম্ভীর আওয়াজ। উদ্যাপনের চূড়ান্ত মুহূর্তে, গতি যখন একদম তুঙ্গে পৌঁছায়, তখন মাটিতে বসে থাকা পুরো দলটি একসঙ্গে লাফিয়ে উঠে গগনবিদারী গর্জনে মেতে ওঠে।
সিএনএনের একটি ভিডিও প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমবার যারা এটি দেখেন বা করেন, তাদের জন্য সবার সঙ্গে তাল মেলানো কিছুটা কঠিন হতে পারে। তবে একবার সবাই একই ছন্দে মেতে উঠলে, তা এক অভূতপূর্ব ও রোমাঞ্চকর দৃশ্যের জন্ম দেয়।
নরওয়েজিয়ান সমর্থকদের এই উদযাপন কিন্তু হুট করে তৈরি হওয়া কোনো ট্রেন্ড নয়। এর শেকড় প্রোথিত আছে তাদের হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাসে।
ইয়াহু স্পোর্টসের তথ্য অনুযায়ী, অষ্টম শতাব্দীর শেষের দিকে ভাইকিংরা তাদের বিখ্যাত লম্বা কাঠের নৌকায় (লংশিপ) চড়ে সমুদ্রপথে পুরো ইউরোপ কাঁপিয়ে বেড়াত। তারা ছিলেন মূলত সমুদ্রগামী নর্স যোদ্ধা, বণিক এবং দুঃসাহসী অভিযাত্রী।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, তাদের সেই লংশিপগুলো ৫৫ থেকে ৭৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতো এবং সেগুলোতে দাঁড় টানার জন্য ৬ থেকে ১৬টি পর্যন্ত বেঞ্চ থাকত।
বর্তমান প্রজন্মের নরওয়েজিয়ানরা তাদের সেই দুর্ধর্ষ সামুদ্রিক পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতেই এই প্রতীকী উদযাপন বেছে নিয়েছেন। কাল্পনিক নৌকার দাঁড় টানার এই দৃশ্যটি আসলে তাদের জাতীয় পরিচয় আর গর্বের এক আধুনিক রূপ।
বিশ্বকাপের এই আসরে ‘ভাইকিং রো’ কেবল স্টেডিয়ামের গ্যালারিতেই আটকে নেই, ছড়িয়ে পড়েছে শহরের আনাচে-কানাচে।
এবিসি নিউজ জানায়, নিউইয়র্ক শহরের সাবওয়ে ট্রেন, স্টেশন, এমনকি আইকনিক টাইমস স্কয়ারের বুকেও নরওয়েজিয়ান সমর্থকদের এই উদযাপন করতে দেখা গেছে। বোস্টনের টিডি গার্ডেনের সামনের চলন্ত এস্কেলেটরে বসেও একদল সমর্থককে কাল্পনিক নৌকার দাঁড় টানতে দেখা যায়।
এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত জনপ্রিয় টেলিভিশন শো ‘গুড মর্নিং আমেরিকাতেও’ নরওয়ের একদল সমর্থক হাজির হয়ে এই ভাইকিং রো প্রদর্শন করেন।
সিএনএনের প্রতিবেদনে ‘মিস্টার রো রো’ নামের এক ব্যক্তির কথাও উঠে এসেছে, যিনি এই ঐতিহ্যকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করতে মূল ভূমিকা রাখছেন।
তবে সবচেয়ে অভাবনীয় দৃশ্যটি দেখা গেছে খোদ নরওয়ের পার্লামেন্টে।
এই ট্রেন্ডের জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে যে, নরওয়েজিয়ান রাজনীতিবিদরা পার্লামেন্টের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করে এই উদ্যাপনে মেতে ওঠেন।
খোদ পার্লামেন্টের স্পিকার ড্রামে তাল তুলছিলেন আর দেশের শীর্ষ নেতারা আসন ছেড়ে বসে কাল্পনিক নৌকার দাঁড় টানছিলেন। রাজনীতিবিদদের এমন রসাত্মক কোরিওগ্রাফির ভিডিওটি অনলাইনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে বাহবা কুড়ায়।
নরওয়ে সর্বশেষ বিশ্বকাপে খেলেছিল ১৯৯৮ সালে। দীর্ঘ ২৮ বছর পর, আর্লিং হালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডের মতো বিশ্বমানের তারকাদের হাত ধরে তারা আবার বিশ্বমঞ্চে ফিরেছে।
বিশ্বকাপে আসার আগে নরওয়ে জাতীয় দল একটি বিশেষ ফটোশুটে অংশ নিয়েছিল। সেখানে খেলোয়াড়দের ভাইকিংদের ঐতিহ্যবাহী ঢাল, তলোয়ার, তীর-ধনুক আর শিঙা হাতে সমুদ্রসৈকতে পোজ দিতে দেখা যায়, যা তাদের ‘ভাইকিং’ ঐতিহ্যের প্রতি নিবেদনকে আরও স্পষ্ট করে।
আর এই উদযাপন পূর্ণতা পায় গত সোমবার সেনেগালের বিপক্ষে নরওয়ের দুর্দান্ত জয়ের পর। নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে (ফিফা টুর্নামেন্টে যা নিউইয়র্ক/নিউজার্সি স্টেডিয়াম নামে পরিচিত) গ্রুপ ‘আই’-এর ম্যাচে সেনেগালকে ৩-২ গোলে হারায় নরওয়ে।
ম্যাচ শেষ হতেই স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে বসে পড়েন খেলোয়াড়রা। আর্সেনাল অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড ড্রাম হাতে তাল তুলতে শুরু করেন। আর আর্লিং হালান্ডসহ পুরো দল গ্যালারির হাজারো সমর্থকের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মেতে ওঠেন ‘ভাইকিং রোতে’। খেলোয়াড় ও সমর্থকদের এই যৌথ উদযাপনকে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
ফুটবলে নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার ঘটনা অবশ্য এটাই প্রথম নয়। ২০১৬ সালের ইউরো কাপে আইসল্যান্ডের সমর্থকদের ‘ভাইকিং ক্ল্যাপ’ বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল বলে জানায় সিএনএন।
মাথার ওপরে হাত তুলে ধীরে ধীরে তালি বাজিয়ে এক বিকট হুংকার ছাড়তেন আইসল্যান্ডের সমর্থকরা। তবে নরওয়ের ‘ভাইকিং রো’ তার চেয়ে কিছুটা আলাদা ও ডাইনামিক, কারণ এটি আক্ষরিক অর্থেই একটি নৌকাকে সম্মিলিত শক্তিতে সামনে এগিয়ে নেওয়ার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলে।
আবার ডাচ সমর্থকদেরও একটি বিখ্যাত ট্রেন্ড রয়েছে, যেখানে তারা ‘স্নোলেবোল্লেকেস’ গানের তালে দলবেঁধে একসঙ্গে ডান থেকে বামে নাচতে থাকেন। তবে নরওয়ের ভাইকিং রো-র সৌন্দর্য হলো এর সহজ গঠন, যাতে যে কেউ খুব সহজেই অংশ নিতে পারেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই উদযাপনের ভিডিওগুলো এখন কোটি মানুষ দেখছেন। সাবেক খেলোয়াড় ও ফুটবল বিশ্লেষকরাও এই ট্রেন্ডের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তারা এটিকে কেবল সাময়িক কোনো সস্তা ভাইরাল ভিডিও হিসেবে দেখছেন না। বরং ফুটবল ফ্যান সংস্কৃতির অন্যতম মৌলিক ও সম্মানজনক একটি সংযোজন হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
বিশ্বকাপ মানে মাঠের লড়াই ছাপিয়ে বিশ্ব সংস্কৃতির এক মিলনমেলা। নরওয়ের সমর্থকরা তাদের ইতিহাস, হার না মানা মানসিকতা আর রোমাঞ্চপ্রিয় সত্তাকে এই একটি উদ্যাপনের মাধ্যমে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন।
আগামী শুক্রবার বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে কিলিয়ান এমবাপের শক্তিশালী ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে। সেই ম্যাচেও গ্যালারি কিংবা বোস্টনের রাজপথে ভাইকিংদের এই ‘দাঁড় টানা’ হুংকার যে নতুন করে কাঁপন ধরাবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
