উন্নয়ন ব্যয়ে অপচয় কমাতে ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থায় জবাবদিহি বাড়াতে ধীরগতির প্রকল্পগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি শুরু করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ৩০ শতাংশের কম অগ্রগতি হওয়া প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে যেগুলো আর কার্যকর নয়, সেগুলো বাতিল করতে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।
এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, অতিরিক্ত ব্যয় ও অনিয়ম তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, ড্যাশবোর্ডভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা, যোগ্য প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া এবং বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তের আলোকে গত ১৪ জুন সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে এসব নির্দেশনা জারি করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।
অর্থনীতিবিদরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ধীরগতির ও অপচয়মূলক প্রকল্প ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, মন্ত্রণালয়গুলো নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করলে ও ভবিষ্যতে প্রকল্প অনুমোদনের আগে বাস্তবায়নের পূর্ণ প্রস্তুতি নিশ্চিত না করলে এই সংস্কারের সুফল মিলবে না।
গত তিন অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ধারাবাহিকভাবে খারাপ হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৮৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাস্তবায়নের হার নেমে আসে ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশে। ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে এডিপি বাস্তবায়নের গড় হার ৭৯ শতাংশ।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্পগুলো এখনও প্রয়োজনীয় ও কার্যকর কি না, তা মূল্যায়ন করতে পারবে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতে তারা প্রকল্প পুনর্গঠন, পরিধি সংশোধন কিংবা পুরোপুরি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ‘গ্রিন বুক’-এ অন্তর্ভুক্ত নতুন প্রকল্পগুলোর অনুমোদন ও বাস্তবায়ন দ্রুত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি সরকারের নতুন এডিপি আগামী মাস থেকে, অর্থাৎ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতে কার্যকর হবে।
সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন করেছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি।
এই কর্মসূচিতে নির্দিষ্ট বরাদ্দসহ প্রায় ১ হাজার ৩০০টি প্রকল্প রয়েছে। পাশাপাশি ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ব্লক বরাদ্দের আওতায় নতুন আরও প্রায় ১ হাজার ২০০টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ না হওয়া প্রকল্পগুলোর বিলম্ব, অতিরিক্ত ব্যয় ও অনিয়মের কারণ চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে এসবের জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে নিয়মিত প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য ড্যাশবোর্ডভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রকল্প পরিচালকদের নিয়োগ দিতে হবে শুধু পেশাগত যোগ্যতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, উদ্যোগটি ইতিবাচক। তবে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে না পারা প্রকল্পগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত অবশ্যই কঠোর মূল্যায়নের ভিত্তিতে নিতে হবে।
তিনি বলেন, আমি আশা করছি, সিদ্ধান্তগুলো কস্ট-বেনিফিট অ্যানালিইসিসের (ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ) ভিত্তিতেই নেওয়া হবে।
তার ভাষায়, ধরুন, একটি প্রকল্পের মোট ব্যয় ১০০ টাকা। এর মধ্যে ৩০ টাকা ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে। এখন সরকারকে দেখতে হবে, প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফল অবশিষ্ট ৭০ টাকার ব্যয়ের চেয়ে বেশি কি না। তারপরই পরবর্তী অর্থ ছাড়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, সম্ভাব্য সুফল যদি অবশিষ্ট ব্যয়ের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে প্রকল্পটি এডিপিতে রাখা যৌক্তিক। অন্যথায় সেটি বাতিল করা উচিত। সেই বিবেচনায় এডিপি ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ অনেক আগেই নেওয়া দরকার ছিল।
তবে এই সংস্কার বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, আসল প্রশ্ন হলো, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবে কি না, আর হলেও তা সঠিকভাবে হবে কি না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। একটি প্রকল্প যত দিন টিকে থাকে, তত দিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠী নানা ধরনের সুবিধা ভোগ করে।
তিনি আরও বলেন, এডিপিতে দ্রুত নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করলে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তার মতে, এডিপি বাস্তবায়নের দুর্বল হার ও দীর্ঘদিনের অপচয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হলো, একনেকের অনুমোদনের সময় অনেক প্রকল্পই বাস্তবায়নের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকে না।
জাহিদ হোসেন বলেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রায়ই তাড়াহুড়ো করে করা হয়। বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে নকশার ত্রুটি ধরা পড়ে, কাজ ও ক্রয় পরিকল্পনায়ও নানা দুর্বলতা দেখা যায়। ফলে অনুমোদনের পরও প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরু করতে তিন থেকে চার বছর লেগে যায়।
তার মতে, বাস্তবায়নের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার পরই নতুন প্রকল্প একনেকে অনুমোদন দেওয়া উচিত।
গতকাল শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, এডিপি বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক এবং সরকার এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে কাজ করছে।
তিনি বলেন, মানুষকে প্রভাবিত করা বা উন্নয়নের বাহ্যিক চিত্র তুলে ধরার জন্য সরকার কোনো মেগা প্রকল্প নিতে চায় না।
‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আগের সরকারের সময়ে অনুমোদিত সব মেগা প্রকল্প একসঙ্গে বন্ধ করে দিলে বড় ধরনের অপচয় ও নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই সেসব প্রকল্প এখন মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে।
