৮০ বছরে ভেসপা: রোমের রাজপথে বিশাল শোভাযাত্রা

ফেরারি, ল্যাম্বরগিনির মতোই একটি বাহনের খুব কদর করেন ইতালীয়রা। দুই চাকার বাহন ভেসপা তাদের ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে ওঠা ইতালির পুনর্জন্মের গল্প মিশে আছে এর সঙ্গে।

ভেসপার ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত শনিবার কয়েক হাজার আরোহী তীব্র গরম উপেক্ষা করে রোমের রাজপথে এক বিশাল শোভাযাত্রায় অংশ নেন। হাজারো স্কুটারের ইঞ্জিনের শব্দে পুরো রাজধানী মুখরিত হয়ে ওঠে। আয়োজকরা জানান, প্রায় ২৫ হাজার ভেসপা এই শোভাযাত্রায় অংশ নেয়।

গোল হেডলাইট আর উজ্জ্বল রঙের ভেসপাগুলো যখন রোমের রাজপথে নামে, তখন এক অভিনব দৃশ্যের অবতারণা হয়।

ইতালীয় ভাষায় ভেসপা শব্দের অর্থ ভিমরুল। ইঞ্জিনের গুঞ্জনধ্বনির সঙ্গে মিল রেখে এই নামকরণ করা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালের ২৩ এপ্রিল পিয়াজিও কোম্পানি প্রথম ভেসপার নকশা নিবন্ধন করে। আর এভাবেই ভেসপার জন্ম হয়। 

গত বৃহস্পতিবার রোমের উত্তরে অবস্থিত একটি স্পোর্টস কমপ্লেক্স ফোরো ইতালিকোতে ‘ভেসপা ভিলেজ’ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে ভেসপার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদযাপন শুরু হয়। শনিবার রোমের রাস্তায় শোভাযাত্রার মাধ্যমে এর সমাপ্তি ঘটে।

ইতালীয় নাগরিক আন্দ্রেয়া মুসকো বলেন, আমার কাছে ভেসপা হলো জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, এক ধরনের বাঁধনহারা জীবনবোধ, প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করা আর অজানাকে জানা। বলতে গেলে এটি একটি লাইফস্টাইল।

ইতালির রাজধানীর মেয়র রবার্তো গুয়ালতিয়েরি বলেন, ভেসপার ইতিহাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইতালির পুনর্জন্ম ও উত্থানের সঙ্গে মিশে আছে। এটি এক অর্থে আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিরই প্রতীক।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস থেকে নিজের ভেসপা নিয়ে এসেছেন ডেভিড বামোন্ডে। তিনি এএফপি-টিভিকে বলেন, জার্মানি ও ভিয়েনা হয়ে ঘুরে আসার পর আমি অস্ট্রিয়া থেকে রোম পর্যন্ত ভেসপা চালিয়ে এসেছি। এই যাত্রায় আমার দুই সপ্তাহ সময় লেগেছে।

ভেসপার নকশা করা হয়েছিল সাধারণ মানুষের জন্য। উদ্দেশ্য ছিল সাশ্রয়ী যাতায়াতমাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয় করা। তবে পিয়াজিও মূল ব্যবসা ছিল বিমান নির্মাণ। এর পেছনে অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিশেষ রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল।

ফিলিপাইনের বাসিন্দা ইলাক দিয়াজ বলেন, ভেসপার সবচেয়ে চমৎকার দিক হলো এটি বন্ধুত্ব তৈরি করে। এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আপনি ভেসপা পার্ক করেছেন অথচ মানুষের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি। ভেসপা আসলে একটি পরিবারের মতো।

পিয়াজিও গ্রুপের নির্বাহী চেয়ারম্যান মাত্তেও কোলানিনো এই উদযাপন অনুষ্ঠানে বলেন, ভেসপার ইতিহাস হলো যুদ্ধ-পরবর্তী ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়াতে চাওয়া একটি দেশের এগিয়ে যাওয়ার সংকল্পের ইতিহাস।

ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, সামনে এগিয়ে যাওয়ার এই ইচ্ছা কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক পরিবর্তনের দিকে এক শক্তিশালী যাত্রা।

গত বৃহস্পতিবার ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকেও প্রধান সরকারি ভবন পালাজ্জো চিগিতে একটি সাদা ভেসপায় বসে ছবি তুলতে দেখা যায়। 

বিগত ৮০ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে ভেসপার উৎপাদন চলছে। এই দীর্ঘ সময়ে এর নকশায় পরিবর্তন এসেছে ১৬০ বার। বিশ্বজুড়ে বিক্রি হয়েছে প্রায় দুই কোটি ইউনিট। এর মধ্যে ২০ লাখেরও বেশি বিক্রি হয়েছে কেবল গত এক দশকেই। 

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০০টি দেশে ভেসপা স্কুটার বিক্রি হয়। ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেই এটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। ইতালি, ভিয়েতনাম ও ভারতের কারখানায় ভেসপা স্কুটার তৈরি করা হচ্ছে।

Related Articles

Latest Posts