ধ্বংসস্তূপ থেকে সুরের পথে: গাজায় উদ মেরামতকারী এক কারিগরের গল্প

যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্য গাজার নুসেইরাত ক্যাম্পের ভেতর এক অস্থায়ী কারখানা। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মাঝেও সেখান থেকে ভেসে আসছে কোমল সুর। কান পাতলে বোঝা যায়, এই সুর মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র উদ থেকে আসছে।

কাঠের প্যালেট, ত্রাণসামগ্রী বহনকারী বাক্সের ভাঙা টুকরো ও ক্ষতিগ্রস্ত বাদ্যযন্ত্রে ঘেরা ছোট্ট এ কারখানায় নিবিড় মনোযোগে কাজ করে যাচ্ছেন ফিলিস্তিনি কারিগর সুহাইল আবু শাওয়িশ।

একটি ক্ষতবিক্ষত উদের তার ঠিক করছেন তিনি। ধৈর্য ধরে কয়েকদিনের প্রচেষ্টার পর তিনি বাদ্যযন্ত্রটিকে আবার সুরে ফেরানোর চেষ্টা করছেন।

গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মূল্যবান এই বাদ্যযন্ত্রটি তার কারখানায় আসা অসংখ্য উদের মধ্যে একটি।

বার্তাসংস্থা এএফপিকে আবু শাওয়িশ বলেন, ‘তরুণরা এখন তাদের বাদ্যযন্ত্র মেরামত করতে আমার কাছে নিয়ে আসছে।’

এ কথা বলার সময়ই আরেকজন কালো প্লাস্টিকের ব্যাগে মোড়ানো ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র নিয়ে তার কারখানায় প্রবেশ করেন।

কারখানাটির দেয়ালে ঝোলানো সদ্য মেরামত করা বেশ কয়েকটি উদ। যুদ্ধের বিভীষিকার মাঝে এ বাদ্যযন্ত্রগুলো যেন টিকে থাকার প্রতীক।

৬০ বছর বয়সী আবু শাওয়িশের কাছে উদ মেরামত শুধু একটি পেশা নয়। এটাকে এমন এক দায়িত্ব হিসেবে তিনি নিয়েছেন, যার মাধ্যমে তিনি ফিলিস্তিনের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে সংরক্ষণ করে যেতে চান। আর সেটিও এমন এক সময়ে, যখন অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে।

পাঁচ সন্তানের বাবা আবু শাওয়িশ আশির দশকে উদ বাজানো শিখেছিলেন। পরে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় অর্জন করেন বাদ্যযন্ত্র সংরক্ষণ ও মেরামতের দক্ষতা।

তার কারখানা কিংবা ওয়ার্কশপটি এই কাজের জন্য যথাযথ নয়। নেই পর্যাপ্ত উপকরণ, আর সেইসঙ্গে ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে প্রায় পুরোটাই তাকে নির্ভর করতে হয় হাতে চালানো সরঞ্জামের ওপর।

যুদ্ধ চলাকালে প্রথমে বাস্তুচ্যুত হয়ে তিনি দক্ষিণের রাফাহ শহরে যান। পরে শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতে হয় নুসেইরাত শরণার্থী ক্যাম্পে।

ছোট ওই কারখানায় তিনি হাত করাত দিয়ে কাঠ কাটেন, আরেকটি লোহার রেতি দিয়ে মসৃণ করেন এবং ব্যবহারের উপযোগী নয় এমন  ভাঙা অংশ ধৈর্যের সঙ্গে জোড়া লাগান।

নীল শার্ট ও জিন্স পরা মাথাভর্তি সাদা চুলের আবু শাওয়িশকে দেখেই মনে হচ্ছিল এক অভিজ্ঞ কারিগর। তিনি বলেন, ‘কাঠের সংকট ও উচ্চমূল্য সত্ত্বেও মানুষ আমার কাছেই আসে। যুদ্ধের কষ্টের মধ্যেও আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’

তার কাছে একটি বাদ্যযন্ত্রকে সুরে ফিরিয়ে আনা মানে চারপাশের ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে একেকটি ছোট্ট বিজয়।

আবু শাওয়িশ বলেন, ‘আমি উদ কিনতে ভালোবাসি, আর আমি নিজেও একজন উদবাদক।’

মানুষ তার কাছে আসেন এই বিশ্বাসে—কয়েক শতাব্দী ধরে আরব সংস্কৃতিতে প্রতিধ্বনিত হওয়া উদের সেই উষ্ণ ও স্বতন্ত্র সুর আবার ফিরিয়ে দিতে পারবেন বলে মনে করেন এই উদ-বাদক।

তবে তার চ্যালেঞ্জও কম নয়। উদ তৈরিতে ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের কাঠ এখন আর পাওয়া যায় না বললেই চলে। আমদানি নিষেধাজ্ঞা ও উপকরণের সংকট আবু শাওয়িশকে নতুন উপায় খুঁজে নিতে বাধ্য করেছে।

এখন তিনি ত্রাণসামগ্রীর বাক্স থেকে কাঠ সংগ্রহ করে, সেগুলোকে বাদ্যযন্ত্র মেরামতের বিকল্প উপাদান হিসেবে ব্যবহার করছেন। আর বেশ ক্ষতিগ্রস্ত উদের যে অংশগুলো ব্যবহারযোগ্য, সেগুলো খুলে অন্য বাদ্যযন্ত্র মেরামতে কাজে লাগানো হয়।

আবু শাওয়িশ বলেন, ‘কোনো কাঠই পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা ত্রাণের বাক্সের ফেলে দেওয়া কাঠ কিনে আনি এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাদ্যযন্ত্রের অংশ ব্যবহার করে অন্য বাদ্যযন্ত্র মেরামত করি।’

উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এ সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তার ভাষ্য, আগে যে আঠার দাম ছিল ২০ শেকেল (প্রায় ৬ দশমিক ৭ ডলার), এখন তা ৬০ শেকেলে বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে থিনারের দামও অনেক বেড়েছে, ফলে প্রয়োজনীয় উপকরণ অনেক কারিগরের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কাঠের কাজের জন্য বিদ্যুৎচালিত যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগও নেই তার কাছে। আবু শাওয়িশ বলেন, ‘আমরা করাত ও ফাইল দিয়ে পুরো কাজ হাতে করি, যা খুবই কঠিন।’

এতে প্রতিটি বাদ্যযন্ত্র মেরামতে অনেক বেশি সময় লেগে যায়। তবুও আবু শাওয়িশ হাল ছাড়তে রাজি নন।

কর্মশালার ভেতর সূর্যের আলো এসে পড়ার সময় তিনি মাত্র ঠিক করা করা একটি উদের তারগুলোতে আলতো করে আঙুল বোলান।

সঙ্গে সঙ্গে উদটি এমন এক সুর তোলে—যা মুহূর্তের জন্য হলেও বাইরের সব দুর্ভোগকে ছাপিয়ে যায়।

আবু শাওয়িশের স্বপ্ন একদিন তিনি আন্তর্জাতিক মানের ফিলিস্তিনি বাদ্যযন্ত্র তৈরি করবেন। যা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবে এবং গাজার কারুশিল্পকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং কাঠ, আঠা ও অন্যান্য উপকরণ আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে।’

‘আমরা চাই বিশ্বের অন্য সবার মতো কাজ করতে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে এবং এমন পণ্য তৈরি করতে, যা নিয়ে গর্ব করে বলতে পারব—এটি ফিলিস্তিনে তৈরি, এটি গাজায় তৈরি,’ বলেন তিনি।

কথাগুলো বলতে বলতেই সদ্য ঠিক করা একটি উদের তারে আলতো করে টোকা দিয়ে সুর মিলিয়ে নেন এ কারিগর। চোখে তার জ্বলজ্বল করছে সুদিনের স্বপ্ন।

Related Articles

Latest Posts