দক্ষিণ লেবাননের বহু ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েল

ইসরায়েলি হামলায় দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দেশটির সংস্কৃতিমন্ত্রী ঘাসান সালামে।

তিনি বলেন, উপকূলীয় শহর টায়ারের ইউনেস্কো স্বীকৃত প্রত্নস্থলের একটি প্রাচীন স্তম্ভের মুকুট উড়ে গেছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় অন্য একটি  শহরে মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয় সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান ধ্বংস হয়ে গেছে। এ ছাড়া, নাবাতিয়েহ শহরের মামলুক আমলের বাজারে ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালানো হয়েছে এবং সীমান্তবর্তী কয়েকটি শতাব্দী-প্রাচীন জনপদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

সালামের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে পরিচালিত প্রায় চার মাসব্যাপী ইসরায়েলের বিমান ও স্থল অভিযানে দক্ষিণ লেবাননের বহু মূল্যবান ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, এক সপ্তাহ আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও লেবাননের ভেতরে প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীর এলাকা এখনও ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনও পাওয়া সম্ভব হয়নি।

‘দখলদারিত্বের ছায়ায় আমরা কাজ করতে পারি না,’ বলেন তিনি।

এই দখলকৃত এলাকার মধ্যেই রয়েছে মধ্যযুগীয় বিউফোর্ট দুর্গ এবং বহু শতাব্দী ধরে খ্রিস্টান, শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের বসবাস করা গ্রাম ও তাদের উপাসনালয়।

সালামে বলেন, ‘এমন কিছু গ্রাম রয়েছে যেগুলো পুরোপুরি বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, দখলকৃত এলাকার বাইরেও টায়ার ও নাবাতিয়েহর মতো প্রাচীন শহরগুলোতে ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তিবনিন শহরেও তীব্র বোমাবর্ষণ হয়েছে, যার ফলে সেখানে অবস্থিত ক্রুসেডার যুগের দুর্গটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সালামে বলেন, ‘ঐতিহ্য শুধু রোমান বা ফিনিশীয় নিদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ঐতিহ্য মানে ঐতিহাসিক ভবন, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্বসম্পন্ন স্থাপনাও।’

রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা বেসামরিক অবকাঠামোর অতিরিক্ত ক্ষতি করতে চায় না এবং কেবল সামরিক প্রয়োজনেই হামলা চালায়।

একইসঙ্গে সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোর বিষয়ে কঠোর অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় বলেও দাবি করেছেন তারা।

ইসরায়েল এর আগে বিউফোর্ট দুর্গে হিজবুল্লাহ অস্ত্র মজুত রেখেছে বলে অভিযোগ করেছিল, যদিও লেবাননের কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত প্রাচীন নিদর্শন

আধুনিক লেবানন ফিনিশীয়, বাইজেন্টাইন, মামলুক ও ক্রুসেডারসহ বিভিন্ন সভ্যতার মিলনস্থল। এসব সভ্যতার রেখে যাওয়া মন্দির, দুর্গ ও সমাধিসৌধ দেশটির ঐতিহাসিক পরিচয়ের অংশ।

প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো টায়ার শহর ও তার রোমান ধ্বংসাবশেষও সেই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের নিদর্শন। একসময় দ্বীপ দুর্গ হিসেবে গড়ে ওঠা এই শহরটি পরবর্তীতে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের বাহিনীর মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়।

অতীতে বহু সংঘাতে টিকে থাকলেও সাম্প্রতিক যুদ্ধে শহরটির বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ধুলোয় ঢাকা ও ভাঙা কাচের গাড়িগুলো এখনও ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন স্তম্ভগুলোর আশেপাশে।

ইসরায়েলি হামলা বা ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রাচীন নিদর্শনগুলোকে রক্ষার জন্য স্থাপন করা প্রতিবন্ধকগুলোও বিস্ফোরণে উড়ে গিয়ে উল্টো প্রত্নস্থানের মধ্যেই ছিটকে পড়েছে।

লেবাননের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তা আদনান ইস্তানবুলি একটি রোমান মোজাইকের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতির অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যেন নিচ থেকে সবকিছু বিস্ফোরিত হয়েছে, অথবা কোনো ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে।’

টায়ারের উপমেয়র আলওয়ান শরাফেদ্দিন বলেন, ‘এটি এমন একটি শহর, যা আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত থাকার কথা এবং কোনো সংঘাতেই যার ওপর হামলা হওয়ার কথা নয়।’

বাড়তি সুরক্ষার দাবি

গত মাসে ইউনেস্কো এক বিবৃতিতে টায়ারের সংরক্ষণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটি জানায়, বর্ধিত সুরক্ষার আওতায় থাকা এই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের অবস্থা উদ্বেগজনক।

একইসঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলীয় চামা শহরের একটি দুর্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর এবং বিউফোর্ট দুর্গের আশপাশে সংঘর্ষ নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউনেস্কো। সাংস্কৃতিক সম্পদের ওপর বেআইনি হামলারও নিন্দা জানায় সংস্থাটি।

মার্চ মাসে ইরানের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো নিয়েও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছিল ইউনেস্কো।

টায়ারের প্রত্নস্থানে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ শুরু হলে সালামে ইউনেস্কোর কাছে শহরটিকে ‘বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানান। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সুরক্ষার দায়বদ্ধতা আরও বাড়বে। তবে এখনও সেটি ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ যুদ্ধ চলাকালে বলেছিলেন, লেবাননের সীমান্তবর্তী সব বাড়িঘর ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

সালামের আশঙ্কা, ইসরায়েলের এই অভিযান লেবাননের শত শত বছরের ইতিহাস স্থায়ীভাবে মুছে ফেলতে পারে।

তার ভাষায়, ‘এখানে একটি সুপরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ চলছে—গ্রাম, জনপদ ও পুরো শহরগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হচ্ছে।’

Related Articles

Latest Posts