রাঙ্গামাটিতে তীব্র গরম ও অনাবৃষ্টিতে কাপ্তাই লেকের পানি কমে যাওয়ায় কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে দুটি।
এছাড়া লেকে পানি কমতে থাকায় রাঙ্গামাটি জেলা সদরের সঙ্গে পাঁচ উপজেলার নৌ যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে, বেড়েছে ভোগান্তি ও ঝুঁকি।
১৯৬০ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে কাপ্তাই উপজেলায় কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে ৭২৫ বর্গকিলোমিটারের কাপ্তাই লেকের সৃষ্টি। দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির পাঁচটি ইউনিট থেকে প্রতিদিন ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়।
বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চালু তিনটি ইউনিট থেকে মোট ৯৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এক নম্বর ইউনিট থেকে ৩৫, দুই ও চার নম্বর ইউনিট থেকে ৩০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
বর্তমানে কাপ্তাই লেকে পানি রয়েছে ৭৫ দশমিক ৮১ ফুট। যদিও বছরের এই সময়ে লেকে পানি থাকার কথা ৮৪ দশমিক ১৬ ফুট।
লেকে পানির স্তর কমে যাওয়ায় জেলা সদরের সাথে পাঁচটি উপজেলা—বাঘাইছড়ি, লংগদু, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ির নৌ যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। যাত্রী নিয়ে নিদিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না লঞ্চগুলো। ফলে যাতায়াতের খরচও বেড়েছে। এছাড়া লেকের মাঝে কিছু ডুবোচরে লঞ্চ ও ইঞ্জিন চালিত ট্রলার বোটগুলো আটকে গিয়ে দুর্ঘটনাও ঘটছে।
গত ২৬ মার্চ জুরাছড়ি উপজেলা থেকে রাঙ্গামাটি যাওয়ার পথে পানির নিচে থাকা গাছের গুঁড়ি সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে একটি লঞ্চের তলা ফেটে যায়। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটলেও বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা পান প্রায় ২০০ যাত্রী।
জুরাছড়ির বাসিন্দা সুরেশ কুমার চাকমা বলেন, ‘রাঙ্গামাটি শহর থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী লঞ্চ বরকল ও জুরাছড়ি উপজেলার সীমানায় নতুন বাজার পর্যন্ত আসতে পারে। সেখান থেকে ছোট ট্রলার বোটে করে জুরাছড়ি উপজেলার রাস্তার মাথা পর্যন্ত আসতে হয়। সেখান থেকে বাকি পথ মোটরসাইকেলে করে উপজেলা সদর পর্যন্ত আসতে হয়। এতে যাতায়াতে খরচ পড়ে আগের তুলনায় ৪-৫ গুণ।’
বিলাইছড়ির উপজেলার এক ব্যবসায়ী কুদ্দুস বলেন, ‘লেকে পানি এখন একদম নাই বলে চলে। জেলা শহর থেকে মালামাল নিয়ে উপজেলায় পৌঁছাতে খুব কষ্ট হয়। পরিবহন ভাড়া বেশি হওয়ায় আমরা চরম বিপাকে পড়েছি। বৃষ্টি না হলে পানি যদি না বাড়ে হয়তো কষ্ট আরও বাড়বে।’
বরকল উপজেলায় বাসিন্দা ভাগ্য রতন চাকমা বলেন, ‘পানি কমে যাওয়ায় আমাদের যোগাযোগে খুব কষ্ট হচ্ছে। জরুরি কাজে জেলা সদরে সবসময় যাতায়াত করতে হয়। পানি কমে যাওয়ার লঞ্চগুলোও ঠিকমতো চলতে পারছে না। মাঝে মাঝে লঞ্চগুলো চরে আটকে গিয়ে দুর্ঘটনাও ঘটছে।’
ডেইলি স্টারকে রাঙ্গামাটি লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি মঈন উদ্দীন সেলিম বলেন, প্রায় তিন দিন ধরে আমাদের বাঘাইছড়ি উপজেলায় লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। অন্যান্য উপজেলাগুলোতে কোন রকম অর্ধেক পর্যন্ত যেতে পারে। বৃষ্টিপাত না হলে, লেকের পানি না বাড়লে লঞ্চগুলো চলাচল করতে পারে না। প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে নৌপথে যাতায়াতে পাঁচ উপজেলার মানুষের দুর্ভোগে পড়তে হয়। দ্রুত কাপ্তাই লেকটি খনন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’
কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন লেকের পানির ওপর নির্ভর করে। লেকে পানি বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ে আর পানি কমে গেলে উৎপাদনও কমে। এপ্রিল মাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পানি সংকটে সবগুলো ইউনিট চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের আপাতত দুটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। তিনটি ইউনিট চালু রয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাত না হলে সচল ইউনিটগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড রাঙ্গামাটি জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী তয়ন কুমার ত্রিপুরা বলেন, ‘কাপ্তাই লেক খননের দাবি এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের। ইতোমধ্যে নদীপথ খননে ৬৮৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। আশা করছি চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে কাজ শুরু করতে পারব। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে মানুষের দুর্ভোগ দূর হবে।’
