গত সোমবার সকালটা ছিল আর দশটা দিনের মতোই। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রান্নার গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ার কথা বলতেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন ৩২ বছর বয়সী সালিম খাদের আল-আশকার।
গাজার খান ইউনিসের উত্তর-পূর্বে আল-কারারা এলাকায় গ্যাস সংগ্রহ করতে যাওয়ার পথেই ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান তিনি।
সারাজীবন গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে যে মানুষটি দলকে আগলে রেখেছেন, নিজের পরিবারকে আগলে রাখতে গিয়েই থেমে গেল তার জীবন।
গাজার ফুটবলার সালিমের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (পিএফএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার ক্রীড়াঙ্গনের অন্তত এক হাজার নয় জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে শুধু ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ৫৬৭ জন।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ছয় বোনের একমাত্র ভাই সালিম। মাত্র কিছুদিন আগে বিয়ে করা এই তরুণ প্রথম সন্তানের বাবা হওয়ার অপেক্ষাতেও ছিলেন। এ বছরের ২৬ জানুয়ারি বিয়ের পর সংসার সাজানোর স্বপ্ন দেখা এই তরুণের জীবন থেমে গেছে সন্তান জন্মের আগেই।
সালিমকে বড় করে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা তার চাচা, পিএফএর রেফারিজ কমিটির সদস্য ক্যাপ্টেন ফারিদ আল-আশকার আল জাজিরাকে বলছিলেন কীভাবে একজন সাধারণ তরুণের মতোই পরিবারের প্রয়োজনে বেরিয়েছিল সালিম।
তার ভাষ্য, দখলদার বাহিনীর গুলিই সালিমের প্রাণ কেড়ে নিল।
ছোটবেলা থেকে গোলরক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন সালিম। আল-আকসা, শাবাব খান ইউনিস, আল-মাসদার ও খাদামাত খান ইউনিসসহ বিভিন্ন স্থানীয় ক্লাবে খেলেছেন তিনি।
চাচার স্মৃতিচারণে উঠে আসে, চুক্তির সময় পারিশ্রমিকের চেয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করাটাই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, খাদামাত খান ইউনিস ক্লাবের সভাপতি আবদুলগনি আল-শেখের কাছে এই মৃত্যু খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং সমর্থকদের জন্য গভীর এক আঘাত।
তিনি মনে করিয়ে দেন, পরিসংখ্যানে পরিণত হওয়ার আগেই প্রতিটি নিহত মানুষের জীবনে নিজস্ব একটি গল্প থাকে। তার বর্ণনায় সালিম ছিলেন তরুণদের কাছে অনুকরণীয় এক প্রাণবন্ত মানুষ।
যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ শুধু মানুষের জীবন কাড়েনি, গুঁড়িয়ে দিয়েছে গাজার হজারো ক্রীড়া অবকাঠামো। স্টেডিয়াম, ক্লাব ভবন, প্রশাসনিক দপ্তর, সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাদামাত খান ইউনিসের নিজস্ব স্থাপনাও এই ধ্বংসযজ্ঞে কবলে পড়েছে।
ক্যাপ্টেন ফারিদের কণ্ঠে ফুটে ওঠে ফিফা ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোর প্রতি একরাশ অভিমান আর ক্ষোভ। গাজার ফুটবলার ও ক্রীড়া কর্মকর্তাদের ওপর চলা হামলার বিষয়ে তাদের নীরবতাকে তিনি ভণ্ডামি বলে মনে করেন।
সম্প্রতি পিএফএ সভাপতি জিবরিল রাজউবকে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের অনুমতি না দেওয়াকে তিনি দেখছেন একই বৈষম্যের ধারাবাহিকতা হিসেবে।
এত মৃত্যু আর ধ্বংসের মধ্যেও গাজার ফুটবল সম্প্রদায় খেলাটাকে ছেড়ে দিতে রাজি নয়। ক্যাপ্টেন ফারিদ গর্ব করেই বলেন, সীমিত সম্পদ আর ভাঙাচোরা মাঠ নিয়েই পিএফএ প্রিমিয়ার ও যুব লিগের টুর্নামেন্ট চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে।
আল-শেখ বলেন, যুদ্ধ পরবর্তী সময় অবকাঠামোকে ছাপিয়ে মানুষের ভেঙে পড়া মনোবল গড়ে তোলারও সময়। স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় খাদামাত খান ইউনিস ইতোমধ্যে একটি ক্ষতিগ্রস্ত ইনডোর ক্রীড়া হল মেরামতের কাজ শুরু করেছে, যাতে গাজার তরুণেরা আবার সেখানে ফিরতে পারে।
সালিমের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকার করেছেন আল-শেখ। তিনি বিশ্বাস করেন, আগামী প্রজন্মের হাতে ফুটবলের স্বপ্ন তুলে দেওয়াই হবে শহীদদের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা।
তার ভাষ্য, তারা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়াই হবে শ্রদ্ধা জানানোর প্রকৃত উপায়।
