টানা ৩ দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে জেলার ১৬ হাজার ৭০০ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
বন্যার পানিতে ডুবে রাজনগর উপজেলায় একজন মারা গেছেন। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় ও সড়কের কালভার্ট ধসে পড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মক ব্যহত হয়েছে।
বন্যার পানিতে ডুবে মারা যাওয়া আশরাফ আলী ওরফে আশই মিয়া (৭০) রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের আকুয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।
টেংরা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মতিন মিয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আজ শুক্রবার সকালে ইউনিয়নের ভাঙারহাট-আকুয়া এলাকায় বাঁধের পাশে আশরাফ আলীর মরদেহ ভেসে ওঠে।’
তিনি জানান, পুরো এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে থাকায় চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রতিটি পরিবারকে সতর্ক থাকতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।
বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে নিচু এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে।
ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান মতিন জানান, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের রাজনগরে মনু নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। বৃহস্পতিবার রাতে ইউনিয়নের উজিরপুর, হরিপাশা এলাকায় মনু নদী প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙন সৃষ্টি হয়। ফলে ইউনিয়নের প্রায় ২০ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
ইউনিয়নের উজিরপুর, হরিপাশা, ইব্রাহীমপুর, কাঁচারী, একামধু, কান্দিরকুল ও পন্ডিতনগর গ্রাম প্লাবিত হয়েছে বলে জানান তিনি।
এছাড়া রামভদ্রপুর, সালন, পাইকপাড়া, ডেফলউড়া, গনেশপুর, আকুয়া, কোনাগাঁও, টগরপুর, ভাঙ্গারহাট এলাকায় বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে, কমলগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী মখাবিল এলাকায় ধলাই নদীর বাঁধের একাংশ ভেঙে যাওয়ায় ইসলামপুর, আদমপুর, মখাবিল, গোলের হাওর, ভান্ডারিগাঁও, গঙ্গানগরসহ প্রায় ২০টি প্লাবিত হয়েছে।
এতে প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
আদমপুর গ্রামের সাতির মিয়া ডেইলি স্টারকে জানান, বুধবার রাতে ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়।
কমলগঞ্জ ভান্ডারীগাও উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খুরশেদ আলী জানান, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ২ ফুট পানি জমে যাওয়ায় চলমান পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
অতি বর্ষণে পাহাড়ি ঢল নেমে কমলগঞ্জের মাধবপুর সড়কে নুরজাহান চা বাগানের গোয়ালবাড়ি এলাকায় একটি কালভার্ট ধসে পড়েছে।
মখাবিল এলাকার জয়নাল আবেদিন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ধলাই নদীর মখাবিলে বাঁধ আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ড ঠিকমতো কাজ করলে এখন এত বড় ক্ষতি হতো না। রাতারাতি ঘরে পানি ঢুকে সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।’
‘রাতে হঠাৎ বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকতে শুরু করে। তখন পরিবার নিয়ে বের হওয়া অনেক কষ্টের ছিল। আশপাশের গ্রামগুলো তলিয়ে গেছে,’ বলেন তিনি।
টেংরা ইউনিয়নের স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. সানুর মিয়া বলেন, ‘আমরা বারবার চেষ্টা করছি বাঁধ রক্ষার জন্য। পানি বেড়ে যাওয়ায় তা আর রক্ষা করা যায়নি।’
মৌলভীবাজার ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসার মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানান, জেলার ৪ উপজেলার ৪২ ইউনিয়ন ও ৩ পৌরসভা বন্যায় আক্রান্ত। মোট ৪ হাজার ২৭৫ পরিবারের প্রায় ১৬ হাজার ৭০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বন্যায়।
জেলার ৩১ আশ্রয়কেন্দ্রে মোট ৯২ পরিবারের প্রায় ৩৭০ জন আশ্রয় নিয়েছে। দুর্গতদের সহায়তায় ৭৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার, ৫ লাখ টাকা নগদ এবং ৫ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরাও জানান, জেলার ৫০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। এছাড়া জেলায় মোট ১১টি মেডিকেল টিম চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে।
রাজনগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বিপুল সিকদার ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মনু নদীর বাঁধ ভাঙনের কারণে টেংরা ও কামারচাক ইউনিয়ন এবং সদর উপজেলার চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের বেশ কিছু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।’
কমলগঞ্জের ইউএনও মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বুধবার বিকেলে ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ উজানের প্রবল স্রোতে ভেঙে গেছে। এতে অনেকগুলো গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।’
যোগাযোগ করা হলে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ-বিন-অলিদ ডেইলি স্টারকে জানান, ‘মনু নদীর রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে পানি কমছে। তবে এখনো বিপৎসীমার ৪ সেন্টিমিটার উপরে রয়েছে। চাঁদনীঘাটে মনু নদীর পানি স্থির এবং বিপৎসীমার ৮০ সেন্টিমিটার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারা নদীর শেরপুর পয়েন্টে পানি ধীরে বাড়ছে, তবে এখনো বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার নিচে। জুড়ি নদীর পানিও বাড়ছে, তবে বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার নিচে।’
বাঁধ সংস্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পানি কমলে বাঁধের ভেঙে যাওয়া অংশের কাজ করা হবে।
