২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ অর্থনৈতিক সংকট বাড়াতে পারে: সরকারি প্রতিবেদন

দেশের ভেতরে ও বৈশ্বিক বহুমুখী সংকটে এমনিতেই চাপে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। সরকারের একটি নতুন প্রতিবেদন বলছে, এমন সংকটের মধ্যেই ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে দেশের অর্থনীতি আরও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলতে পারে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে তেল সরবরাহে বিঘ্ন এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করলে বাংলাদেশের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ এই দুটি অঞ্চলই বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার।

এতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা (ওভারক্যাপাসিটি) নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে। একই সঙ্গে শিশুশ্রম ও জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানিতে বিধিনিষেধ জোরদার করার নীতিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একক বৃহৎ রপ্তানি বাজার।

আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) বৈঠককে সামনে রেখে সরকার এ প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যে নিউইয়র্কে অবস্থান করছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সূচি আরও তিন বছর পিছিয়ে দিয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়ার পক্ষে অন্যান্য দেশের সমর্থন আদায়ে তারা কাজ করছেন।

বাংলাদেশ, নেপাল ও লাওসের আগামী নভেম্বরে এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। তবে নজিরবিহীন রাজনৈতিক, সামষ্টিক অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও বৈশ্বিক ধাক্কার কারণে বাংলাদেশ ও নেপাল প্রস্তুতির সময় আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত করার আবেদন জানিয়েছে।

এর আগে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করার আবেদন অনুমোদনের সুপারিশ করেছে। এখন এ সুপারিশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি কমে যাওয়া এবং জ্বালানি ও সারের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতির ঝুঁকি আরও বেড়েছে। ইতোমধ্যেই অর্থনীতি ধীরগতির প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য বৃদ্ধি ও খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে এলডিসি থেকে উত্তরণ এবং এর ফলে রপ্তানিতে বিদ্যমান বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা হারালে অর্থনীতির ঝুঁকি আরও বাড়বে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশেষ করে রপ্তানি ও ওষুধশিল্পে আন্তর্জাতিক সহায়তামূলক সুবিধাগুলো (ইন্টারন্যাশনাল সাপোর্ট মেজারস বা আইএসএম) বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এসব সুবিধা হারালে দেশের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণকালীন ও পরবর্তী সময়ের অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে এসব আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতাকে চিহ্নিত করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল হয়েছে। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে।

এছাড়া অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা হারানোর ঝুঁকি কমাতে বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শেষ করার জন্যও আরও সময় প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত ছাড় (আইপিআর ওয়েভার) শেষ হয়ে গেলে এবং দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্য বাড়তে থাকায় জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম বেড়ে যেতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ও কর্মসংস্থানে আন্তর্জাতিক সহায়তামূলক ব্যবস্থাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিবেচনায় বর্তমান অনিশ্চয়তার মধ্যে এলডিসি থেকে উত্তরণ সামষ্টিক অর্থনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এতে টেকসই ও নির্বিঘ্ন উত্তরণ বাধাগ্রস্ত হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগের পাঁচ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি বছরে ৬ শতাংশের বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। তবে এরপর থেকে প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে। ২০২২ সাল থেকে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। আর ২০২৫ সালে দারিদ্র্য আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার ফলে আরও বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় এসব পণ্যের আমদানি ব্যয়ও অনেক বেড়েছে। বর্তমানে মোট আমদানি ব্যয়ের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি এসব পণ্যের পেছনে ব্যয় হচ্ছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে সময়ে তেলের আমদানি ব্যয় ৭২ শতাংশ এবং সারের আমদানি ব্যয় ৪৪ শতাংশ বেড়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এলডিসি উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমার আগে পরিস্থিতির উন্নতির কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

প্রতিবেদনটিতে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ঋণ বিতরণ ও বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তহবিলের তীব্র ও কাঠামোগত সংকট তৈরি হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক ঋণের সুদ ও ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়তে থাকায় সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে। ফলে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারি বিনিয়োগ সীমিত হয়ে পড়ছে।

শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজারসুবিধা থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তা এবং দেশে উচ্চ সুদের হার ও জ্বালানির দামের কারণে ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি কমছে।

রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ায় সরকারের ব্যয়ের ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে এবং আগামী তিন বছরের মধ্যে টেকসই ও নির্বিঘ্ন এলডিসি উত্তরণের পথে এগোতে সরকারের অন্তত দুই বছর সময় প্রয়োজন।

Related Articles

Latest Posts