বায়ুদূষণের কারণে দেশের ছয়টি বড় শহরে প্রতিদিন গড়ে ২৪২ জনের অকালমৃত্যু হচ্ছে। এতে প্রতিবছর অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
অতিসূক্ষ্ম কণা বা পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম ২.৫) বলতে ব্যাসে ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে ছোট অতিক্ষুদ্র বায়ুকণাকে বোঝায়। এসব কণা ফুসফুসের ভেতরে ঢুকে রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, পিএম ২.৫ দূষণের কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল—এই ছয়টি বড় শহরে প্রতিবছর প্রায় ৮৮ হাজার ২৪০ জনের অকালমৃত্যু ঘটে। প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে এর হার প্রায় ২৬০ জন।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, পিএম ২.৫ দূষণের কারণে প্রতি বছর প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশের সমান।
গবেষণাটি ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের ক্লাইমেট চেঞ্জ, এয়ার কোয়ালিটি অ্যান্ড হেলথ রিসার্চ (সি২এএইচআর) ইউনিট পরিচালনা করে।
পাবলিক হেলথ ও ইনফরমেটিক্স বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব তেহরান প্রেস থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘পলিউশনে’ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, পিএম ২.৫–সম্পর্কিত মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজ (করোনারি আর্টারি ডিজিজ)। এ রোগে প্রতিবছর আনুমানিক ৩৭ হাজার ৫১৯ জন মারা যান।
এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও ৮ হাজার ৩৪৪টি মৃত্যু এবং ফুসফুসের ক্যানসারে প্রতিবছর মারা যান ৮১১ জন।
ছয়টি শহরের মধ্যে ঢাকায় পিএম ২.৫–জনিত অকালমৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সেখানে বছরে আনুমানিক ৬৮ হাজার ৭০৩ জনের অকালমৃত্যু ঘটে। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম, যেখানে এ সংখ্যা ১১ হাজার ২০২।
অন্যদিকে, রাজশাহীতে ২ হাজার ৮২৭ জন, খুলনায় ২ হাজার ৬২৫ জন, সিলেটে ১ হাজার ৪৮৮ জন এবং বরিশালে ১ হাজার ৩৯৫ জনের অকালমৃত্যু ঘটে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকেরা আরও দেখেছেন, ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ছয়টি শহরেই পিএম ২.৫–জনিত অকালমৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
এর মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে দ্রুত এই মৃত্যু বেড়েছে। সেখানে প্রতি বছর গড়ে ৩ হাজার ৪৮৪টি অকালমৃত্যু যুক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, এটি নগরাঞ্চলের বায়ুমানের ক্রমাবনতির ইঙ্গিত দেয় এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
গবেষণার প্রধান লেখক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমরা প্রায়ই বায়ুদূষণকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখি। কিন্তু আমাদের গবেষণা বলছে, এটি প্রতিবছর প্রায় ৮৮ হাজার মানুষের অকালমৃত্যুর কারণ এবং দেশের জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি করছে।
তিনি বলেন, আমাদের গবেষণার ফলাফল নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হওয়া উচিত। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর এর বোঝা আরও বাড়তে থাকবে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বায়ুমানের নির্দেশিকা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে পিএম ২.৫–জনিত অকালমৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এড়ানো সম্ভব।
গবেষকেরা প্রমাণভিত্তিক বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ নীতি গ্রহণ, পিএম ২.৫ নির্গমনের প্রধান উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণ, সমন্বিত নগর বায়ুমান ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছেন।
