ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল জয়ের পর আর্জেন্টিনার কিছু খেলোয়াড়ের মাঠে রাজনৈতিক ব্যানার প্রদর্শনের ঘটনায় তদন্ত শুরুর কথা জানিয়েছে ফিফা। এর আগে যুক্তরাজ্য সরকারের শীর্ষ মহল থেকে ফিফার কাছে এ বিষয়ে তদন্তের দাবি জানানো হয়।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিফার একজন মুখপাত্র গতকাল বৃহস্পতিবার তদন্ত শুরুর বিষয়টি আল-জাজিরাকে নিশ্চিত করেছেন।
আল-জাজিরাকে ফিফার ওই মুখপাত্র বলেছেন, ‘বর্তমানে ফিফার একটি স্বাধীন শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি ম্যাচ পরবর্তী রিপোর্টগুলো পর্যালোচনা করছে এবং ফিফার শৃঙ্খলা বিধির ভিত্তিতে পরবর্তী সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রাসঙ্গিক সব পরিস্থিতি বিবেচনা করছে’।
আলোচিত ওই ব্যানারটি কোথা থেকে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের কাছে এসেছিল তা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে স্টেডিয়ামের ভেতর ফিফার নিজস্ব শৃঙ্খলাবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ফিফা আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ও ফুটবল ফেডারেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। ফিফার আইন অনুযায়ী স্টেডিয়ামের ভেতর ‘ক্রীড়া আসরের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোনো রাজনৈতিক, আদর্শিক, ধর্মীয় কিংবা আপত্তিকর বার্তা’ প্রদর্শন নিষিদ্ধ।
সাধারণত রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ফিফা ৫ হাজার ডলার থেকে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে। এই ধরণের ঘটনায় ফিফার শাস্তির সিদ্ধান্ত আসতে সাধারণত টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সেক্ষেত্রে স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে আর্জেন্টিনার মাঠে নামতে কোনো সমস্যা হবে না।
এর আগেও বেশ কয়েকবার রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শনের কারণে দলগুলোকে বড় অঙ্কের জরিমানা করেছে ফিফা। ২০১৪ সালে স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে একই বার্তা প্রদর্শনের কারণে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ২০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করেছিল ফিফা।
এদিকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, দেশটির উদারপন্থী ডেমোক্র্যাট নেতা এড ড্যাভি ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন, যেখানে তিনি এই ঘটনার সাথে জড়িত আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইনফান্তিনোকে লেখা ওই চিঠিতে ড্যাভি দুই বছর আগের একই রকম ঘটনায় স্পেনের দুই খেলোয়াড়ের বিপক্ষে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার নেয়া শাস্তিমূলক পদক্ষেপের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। ২০২৪ সালের ইউরো জয়ের উদযাপনের সময় ‘জিব্রাল্টার স্পেনের অংশ’- এই স্লোগান দেয়ায় দুই স্প্যানিশ ফুটবলার আলভারো মোরাতা ও রদ্রিকে এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল উয়েফা।
মাঠে রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শনের দায়ে ফিফাও এর আগে খেলোয়াড়দের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকসের ব্রোঞ্জ মেডেল ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার মিডফিল্ডার পার্ক জং-উ কোরিয়ান ভাষায় একটি চিহ্ন প্রদর্শন করেন, যেখানে লেখা ছিল ‘ডকদো আমাদের এলাকা’। লিয়ানকোর্ট রকস নামে পরিচিত এই দ্বীপ নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে।
এর আগে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিতের পর হঠাৎই হাতে একটি ব্যানার নিয়ে দর্শকসারির দিকে যেতে দেখা যায় দুই আর্জেন্টাইন ফুটবলার লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও জিওভানি লো সেলসোকে। সাদা কাপড়ের উপর কালো কালিতে ওই ব্যানারে লেখা ছিলো ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস’, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনারই’।
দক্ষিণ আটলান্টিকের যেসব দ্বীপ ব্রিটিশদের কাছে ‘ফকল্যান্ড’ এবং আর্জেন্টাইনদের কাছে ‘মালভিনাস’ নামে পরিচিত, সেগুলোর মালিকানা বা সার্বভৌমত্ব নিয়ে দেশ দুটির মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ চলে আসছে। ১৯৮২ সালে এই দ্বীপগুলোকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধও হয়েছিল, যাতে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সৈন্য এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ যোদ্ধা প্রাণ হারান। শেষ পর্যন্ত ব্রিটেন জয়ী হয় এবং দ্বীপগুলোর অধিকাংশ বাসিন্দা ব্রিটেনের অংশ হিসেবেই থেকে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
তবে আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের দাবি হলো, ১৮১৬ সালে স্বাধীনতার পর স্পেন থেকে তারা এই দ্বীপগুলোর মালিকানা লাভ করেছিল এবং ১৮৩৩ সালে ব্রিটেন একটি অবৈধ ঔপনিবেশিক আইনের মাধ্যমে এগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল।
