ব্রিজ, নাকি স্ট্যান্ড? রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাবুবাজার ব্রিজে উঠলেই এমন প্রশ্ন জাগে। সেতুর মাঝখানে ফল ও সবজির ভ্যান, একপাশে বাস ও অটোরিকশা থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা, পাশে অবৈধ ভ্যান ও অটোরিকশার স্ট্যান্ড। যানজট হলেই আবার শুরু হয় উল্টো পথে যান চলাচল। সবমিলিয়ে রাজধানীর এই অন্যতম প্রবেশপথের সেতুতে প্রতিদিনই চরম দুর্ভোগে পড়ছেন হাজারো মানুষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরান ঢাকার বংশাল থেকে কেরানীগঞ্জের কদমতলী পর্যন্ত বিস্তৃত বাবুবাজার সেতুর উভয় প্রান্তেই গড়ে উঠেছে অনানুষ্ঠানিক বাস ও অটোরিকশার স্টপেজ। যাত্রী ওঠানামার জন্য সেতুর ওপরই বাস, অটোরিকশা ও ভ্যান থামানো হচ্ছে। পাশাপাশি সেতুর একপাশজুড়ে বসেছে ফল ও সবজির ভ্রাম্যমাণ বাজার। এতে যান চলাচলের জন্য নির্ধারিত অংশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং দিনের বেশির ভাগ সময়ই সেতুতে লেগে থাকে দীর্ঘ যানজট।
বাবুবাজার সেতুর একপাশে রয়েছে জনাকীর্ণ পুরান ঢাকা আর অন্যপাশে ব্যস্ততম শিল্প এলাকা কেরানীগঞ্জ। গত কয়েক দশকে কেরানীগঞ্জে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন কলকারখানা। ফলে এই এলাকায় ২৪ ঘণ্টাই থাকে মানুষের যাতায়াত। এ ছাড়া পদ্মাসেতু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা যানবাহনের একটি অংশ এই সেতু দিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করে। একদিকে গাড়ির চাপ বৃদ্ধি, অন্যদিকে অনিয়ম-বিশৃঙ্খলায় সৃষ্ট যানজটের কারণে এই সেতু দিয়ে এখন যাতায়াত করাই দুরূহ। যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক সময় গন্তব্যে যেতে যে সময় লাগে, তার থেকে বেশি সময় লাগে শুধু সেতু পার হতেই।
এই সেতু হয়ে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত যাতায়াত করেন কদমতলীর রাজমিস্ত্রি মোহাম্মদ ইয়ামিন। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘ব্রিজের অবস্থা খুবই খারাপ। রাস্তার ওপর দোকান, ভ্যানগাড়ি ও যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকায় আমাদের চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাছাড়া ব্রিজ তো মানুষের যাতায়াতের জন্য, বাজার বসানোর জন্য না।’
সেতুর ওপর বাজার বসানো ও যাত্রী ওঠানামা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আরেক পথচারী কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ব্রিজের ওপর এভাবে বাজার বসানোর কোনো মানেই হয় না। দ্রুতগতির কোনো গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারালে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। একইসঙ্গে ব্রিজে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামাও ঝুঁকিপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিঁড়ির নির্ধারিত স্থান ব্যবহার করা উচিত। এ ছাড়া, অটোরিকশাগুলো নিয়মিত সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে পড়ে এবং যাত্রী নেয়।’
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, যানজট সৃষ্টি হলেই অনেক মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও ভ্যানচালক উল্টো পথে চলাচল শুরু করেন। এতে দুই পাশের যানবাহন মুখোমুখি আটকে পড়ে, সৃষ্টি হয় আরও বড় যানজট। পথচারীদের অভিযোগ, এ ধরনের নিয়মভঙ্গ এখনকার নিত্যদিনের ঘটনা।
পথচারী মোহাম্মদ ফেরদৌস হাসান বলেন, ‘সেতুর ওপর অবৈধভাবে সবজির দোকান বসানো, যানবাহন দাঁড় করিয়ে রাখা ও যাত্রী ওঠানামা এখানকার নিয়মিত চিত্র। সবসময় এখানে যানজট পাবেন। আমরা তো চরম হয়রানির শিকার হই প্রতিদিন।’
তার অভিযোগ, ‘ট্রাফিক পুলিশ থাকলেও এসব অনিয়ম বন্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।’
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্রিজে দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘বাবুবাজার ব্রিজের যানজটের অন্যতম কারণ দুই প্রান্তের সিঁড়ি। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এসব সিঁড়ি ব্যবহার করেন, যার প্রভাব পড়ে যান চলাচলে।’
তিনি জানান, সেতুর ওপর থেকে বাজার উচ্ছেদে একাধিকবার অভিযান চালানো হলেও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি সম্ভব হয় না।
পথচারীদের অভিযোগ, ব্রিজের ওপর অবৈধ স্ট্যান্ড বসাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন ট্রাফিক পুলিশ ও তাদের সাহায্যকারী ট্যাগের কয়েকজন সদস্য। প্রতিটি বাস থেকে তারা টাকা নিয়ে যাত্রী তুলতে দেয়। এ ছাড়া, সবজির ভ্যান ও অটোরিকশা থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা তারা নেন।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বাবুবাজার সেতু এলাকায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের টিআইয়ের অফিসে গেলেও সেখানে তাকে পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে মুঠোফোনে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) বিদ্যুৎ বলেন, ‘যেসব অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার অধিকাংশই ঢাকা জেলার অংশে ঘটে। আমাদের দায়িত্বাধীন অংশে নিয়মিত অভিযান চালানো হয় এবং অবৈধভাবে কোনো যানবাহন দাঁড়াতে দেওয়া হয় না। ব্যবসায়িক কারণে কোনো ভ্যান সাময়িকভাবে মালামাল নামালেও সেটি দ্রুত সরিয়ে দেওয়া হয়।’
সেতু এলাকায় দায়িত্বরত ট্রাফিক সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদা বা টাকা তোলার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে টিআই বিদ্যুৎ উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘কেউ যদি কাউকে ব্যক্তিগতভাবে টাকা দেয়, সেটা আমি কীভাবে ঠেকাব?’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনি ইংরেজি পত্রিকার সাংবাদিক বাংলায় কেন কথা বলছেন? ইংরেজিতে কথা বলেন। আপনি ফোন কেন করেছেন? সামনে এসে কথা বলুন।’
এ মন্তব্য করার পর তিনি কল কেটে দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক-লালবাগ বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘বাবুবাজার সেতুর সমস্যার বিষয়টি আমরা অবগত। আগামী সপ্তাহ থেকে সেখানে বিশেষ অভিযানের পরিকল্পনা রয়েছে।’
সেতুর ওপর অবৈধ সবজির বাজার ও যানবাহনের স্ট্যান্ডের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এসব নিয়ন্ত্রণের দায় শুধু পুলিশের নয়, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থারও।’
পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জনবল সংকটের কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ডিএমপিতে প্রায় ৩৪ হাজার সদস্য থাকলেও ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত রয়েছেন মাত্র প্রায় ৪ হাজার সদস্য। যার ফলে আমরা যথাযথভাবে সবখানে কাজ করতে পারছি না।’
এ বিষয়ে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বাবুবাজার সেতুর ঢাকা জেলার আওতাধীন অংশে কোনো অবৈধ বাজার বা অননুমোদিত পরিবহন স্ট্যান্ড আছে, এমন তথ্য আমার জানা নেই। অভিযোগগুলো যাচাই করে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করে কোনো পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
