বাংলাদেশের অভিনয়জগতের অন্যতম গুণী শিল্পী ডলি জহুর। শঙ্খনীল কারাগার চলচ্চিত্রে ‘রাবেয়া’ চরিত্রে তার অভিনয় আজও দর্শকের মনে দাগ কেটে আছে। আর হুমায়ূন আহমেদের কালজয়ী ধারাবাহিক এইসব দিনরাত্রিতে ‘নীলু ভাবি’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন দর্শকের কাছের মানুষ।
দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপচারিতায় ডলি জহুর ফিরে গেলেন এইসব দিনরাত্রির সেই সময়ের স্মৃতিতে।
ডলি জহুর বলেন, এইসব দিনরাত্রি প্রচার শুরু হওয়ার পর খুব দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন তো একটি মাত্র টেলিভিশন চ্যানেল ছিল। নাটকের গল্প মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল। প্রতিটি চরিত্রই দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিল।
‘আমার চরিত্রের নাম ছিল নীলু। সবাই আমাকে নীলু ভাবি বলেই ডাকত। এরপর বাস্তব জীবনেও অনেকে আমাকে নীলু ভাবি নামেই চিনতে শুরু করেন,’ বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, নাটকটি প্রচারের সময় কোথাও গেলেই মানুষ আমাকে চিনে ফেলতেন। অনেক সম্মান করতেন। কেউ বলতেন, ‘দেখো, নীলু ভাবি যাচ্ছেন।’ একজন শিল্পীর জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে! এই নাটকের জন্য আমি মানুষের অগাধ ভালোবাসা আর সম্মান পেয়েছি।
সেই সময়ে নীলু ভাবির কাছে শত শত চিঠি আসত। কী ধরনের চিঠি আসত জানতে চাইলে ডলি জহুর বলেন, সেই সময় আমার কাছে প্রচুর চিঠি আসত। শত শত চিঠি পেয়েছি। ধানমন্ডির বাসার ঠিকানায় যেমন চিঠি আসত, তেমনি রামপুরার বাংলাদেশ টেলিভিশনের ঠিকানাতেও আমার নামে চিঠি আসত। অনেক খামের ওপর শুধু লেখা থাকত ‘ডলি জহুর, অভিনেত্রী, বাংলাদেশ।’
‘পোস্ট অফিসের কর্মীরা আমার বাসা চিনতেন। তাই ঠিকই চিঠিগুলো পৌঁছে দিতেন। বিটিভিতে যেসব চিঠি আসত, সেগুলোও আমাকে দেওয়া হতো। সত্যি বলতে, কল্পনার চেয়েও বেশি চিঠি পেয়েছি,’ বলেন এই অভিনেত্রী।
দর্শকদের লেখা সেই চিঠিগুলো কি পড়তেন? হেসে ডলি জহুর বলেন, অবশ্যই পড়তাম। খুব যত্ন নিয়ে পড়তাম। কত রকমের চিঠি যে এসেছে! বেশিরভাগ চিঠিতেই লেখা থাকত, ‘নীলু ভাবির মতো পুত্রবধূ চাই।’ কেউ লিখতেন, ‘নীলু ভাবির মতো একজন ভাবি চাই।’ আবার কেউ লিখতেন, ‘নীলুর মতো ভালো একজন মানুষ আমাদের বাড়ির বউ হোক।’
তার ভাষ্য, ‘চিঠিগুলো পড়ে মন ভরে যেত। তখন মনে হতো, মানুষ একটি নাটকের চরিত্রকেও কতটা ভালোবাসতে পারে!’
অনেক চিঠির মধ্যে একটি চিঠির কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে ডলি জহুরের।
তিনি বলেন, ‘একজন বয়স্ক মানুষ আমাকে চিঠি লিখেছিলেন। তিনি নীলু ভাবি ভেবেই লিখেছিলেন। জীবনের শেষ সময়ে এসে তিনি আফসোস করে লিখেছিলেন, আমার যদি নীলুর মতো একজন বৌমা থাকত!’
‘চিঠিটি পড়ে আমি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। সত্যি বলতে, সেই সময়ের চিঠিগুলো ছিল নিখাদ ভালোবাসায় ভরা। অনেক দিন যত্ন করে রেখেছিলাম। এখন আর নেই,’ বলেন ডলি জহুর।
তার ভাষায়, ‘আমি মনে করি, এগুলোই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। একটি চরিত্রে অভিনয় করার জন্য মানুষ আমাকে এত ভালোবেসেছে, মনে রেখেছে, আশীর্বাদ করেছে, চিঠি লিখেছে—এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে! আজও অনেক মানুষ নীলু চরিত্রটির কথা মনে রেখেছেন।’
এইসব দিনরাত্রি প্রচারের সময়ের একটি মজার ঘটনা শোনালেন ডলি জহুর।
‘একদিন আমাদের বাসায় দুজন তরুণ এলেন। তারা জানতে চাইলেন, আমার কোনো ছোট বোন আছে কি না। কারণ, থাকলে তাদের বড় ভাইয়ের সঙ্গে তার বিয়ে দিতে চান! আমি তখন হেসে বলেছিলাম, আমার বোন থাকলেই যে সে নাটকের নীলুর মতো হবে, তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই!’
বর্তমান সময়ের কথা জানতে চাইলে ডলি জহুর বলেন, ‘ভালো আছি। এই বয়সে যতটা ভালো থাকা যায়, ততটাই আছি। নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়, চিকিৎসকের কাছেও যেতে হয়। তারপরও সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ।’
অভিনয় করছেন কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিনয় করছি। তবে খুব কম। মাঝে মাঝে কাজ করি।’
অভিনয়জগতের অনেক শিল্পী তাকে ‘মা’ বলে ডাকেন।
এ প্রসঙ্গে ডলি জহুর বলেন, ‘ঠিকই বলেছেন। অনেক শিল্পী আমাকে মা বলে ডাকে। তখন খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। কী যে ভালো লাগে! ওরা আমাকে অনেক ভালোবাসে। আমিও ওদের নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসি।’
