কেন বাংলাদেশে আবহাওয়া সতর্কবার্তার নতুন শ্রেণিবিন্যাস দরকার

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাতের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না দেশের প্রায় অর্ধশতাব্দী পুরোনো আবহাওয়া সতর্কবার্তার ভাষা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনো ৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টি আর ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিকে একইভাবে ‘অতি ভারী বর্ষণ’ বলা হচ্ছে, ফলে প্রকৃত ঝুঁকির মাত্রা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারি সংস্থাগুলোও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

গত ১৫ জুলাই বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ’-এর পূর্বাভাস দেয়। অধিদপ্তরের বর্তমান শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, দিনে ১–১০ মিলিমিটার বৃষ্টি ‘হালকা’, ১১–২২ মিলিমিটার ‘মাঝারি’, ২৩–৪৩ মিলিমিটার ‘মাঝারি ধরনের ভারী’, ৪৪–৮৮ মিলিমিটার ‘ভারী’ এবং ৮৮ মিলিমিটারের বেশি হলেই তা ‘অতি ভারী’ বৃষ্টিপাত হিসেবে গণ্য হয়।

এই শ্রেণিবিন্যাস স্বাধীনতার পর থেকে কার্যত অপরিবর্তিত রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন অতীতের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র বৃষ্টিপাত হচ্ছে। গত সপ্তাহেই দেশের কয়েকটি এলাকায় ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হয়েছে। অতীতে ২০০১ সালে সন্দ্বীপে একদিনে ৫০১ মিলিমিটার, ২০০৪ সালে ঢাকায় ৩৪১ মিলিমিটার এবং ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর ঢাকায় ২০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৮৯ মিলিমিটার ও ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিকে একই সতর্কবার্তার আওতায় রাখলে মানুষ কিংবা নীতিনির্ধারকেরা প্রকৃত ঝুঁকির মাত্রা বুঝতে পারেন না।

সতর্কবার্তা ছিল, প্রস্তুতি ছিল না

সম্প্রতি চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভয়াবহ পাহাড়ধসের আগে টানা কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। এমনকি পাহাড়ধসের ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছিল।

তবু সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে জরুরি প্রস্তুতি বা সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। এর পরিণতিতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসে ৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। একই সময়ে ঢাকায়ও তীব্র জলাবদ্ধতা ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পূর্বাভাস দিলেই হবে না, সেটি এমন ভাষায় দিতে হবে যাতে ঝুঁকির মাত্রা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় এবং সরকারি সংস্থাগুলো দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।

প্রতিবেশী দেশগুলো কী করছে

ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি) ইতোমধ্যে অনেক বেশি স্তরভিত্তিক সতর্কবার্তা চালু করেছে। গত ৬ জুলাই মুম্বাইয়ে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়ে তারা শুধু বৃষ্টির পরিমাণই জানায়নি, বরং ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করে নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছিল।

আইএমডির শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, ১৫ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হালকা, ১৬–৬৫ মিলিমিটার মাঝারি, ৬৬–১১৫ মিলিমিটার ভারী, ১১৫–২০৪ মিলিমিটার অতি ভারী এবং ২০৫ মিলিমিটার বা তার বেশি হলে তাকে ‘প্রবল ভারী’ বৃষ্টিপাত হিসেবে ধরা হয়।

চীনেও ১০০–২৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিকে ‘প্রবল মুষলধারে বৃষ্টি’ এবং ২৫০ মিলিমিটারের বেশি হলে ‘অত্যন্ত প্রবল’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো দৈনিক নয়, ঘণ্টাভিত্তিক বৃষ্টির তীব্রতা পরিমাপ করে। যুক্তরাজ্যে এক ঘণ্টায় ৮ মিলিমিটার এবং যুক্তরাষ্ট্রে ঘণ্টায় ৭ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতই ভারী বৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়।

পরিবর্তনের কথা ভাবছে আবহাওয়া অধিদপ্তর

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মমিনুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পূর্বাভাসের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। বর্তমানে পাঁচ দিন আগেই প্রায় ৯৫ শতাংশ নির্ভুলতার সঙ্গে বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘গত ৪ জুলাই থেকেই আমরা ভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তা দিয়েছিলাম। ৫ জুলাই পাহাড়ধসের ঝুঁকির কথাও জানিয়েছিলাম। ৬ জুলাই কক্সবাজারে পাহাড়ধস হয়েছে। আমরা অতি ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ধস—দুটো বিষয়েই আগে থেকে সতর্ক করেছিলাম।’

তিনি আরও বলেন, ভারী ও অতি ভারী বৃষ্টিপাতের বর্তমান সীমা বাড়ানোর বিষয়টি অধিদপ্তর বিবেচনা করছে।

‘তবে এটি বাস্তবায়নের আগে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে, যাতে নতুন পরিভাষা মানুষের কাছে পরিষ্কারভাবে পৌঁছায়,’ বলেন তিনি।

অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত পরিবর্তনে ‘অতি ভারী’ বৃষ্টির নিম্নসীমা ৮৯ মিলিমিটার থেকে বাড়িয়ে ১৫০ মিলিমিটার করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে পুরো শ্রেণিবিন্যাসই নতুন করে সাজাতে হবে।

প্রযুক্তিতে অগ্রগতি, এখন প্রয়োজন সমন্বয়

ইতোমধ্যে আবহাওয়া অধিদপ্তর নতুন ওয়েবসাইট চালু করেছে, যেখানে প্রচলিত সতর্কবার্তার বদলে কমন অ্যালার্ট প্রোটোকল-ভিত্তিক (সিএপি) রঙিন ঝুঁকি সূচক ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে উপজেলা পর্যায়ের ক্ষুদ্র পরিসরের পূর্বাভাস, পাশাপাশি কৃষক, নৌযান ও বিমান চলাচলের জন্য আলাদা সতর্কবার্তাও দেওয়া হচ্ছে।

এখন পাঁচ থেকে সাত দিন আগেই ভারী বৃষ্টি ও তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে অধিদপ্তর।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়লেও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ে সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।

দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসেও জোর দেওয়ার আহ্বান

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ রাশেদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উপগ্রহের তথ্য ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তার সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু পূর্বাভাসের সক্ষমতা আরও বাড়াতে পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামো, উন্নত ডেটা বিশ্লেষণ ব্যবস্থা, উচ্চ রেজ্যুলেশনের পূর্বাভাস মডেল এবং পূর্বাভাসকারীদের প্রশিক্ষণে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।

তার মতে, বর্তমানে তিন থেকে সাত দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ওপরই মূল জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে মৌসুমি ও দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পূর্বাভাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, এজন্য এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশনসহ (এনসো) বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ামকগুলোর সারা বছর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মাসভিত্তিক পূর্বাভাস জোরদার করতে হবে।

রাশেদ চৌধুরীর ভাষায়, ‘বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বিশ্বের অন্যতম সফল দেশ। কারণ ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করে। ভারী বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।’

Related Articles

Latest Posts