মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ফ্রন্ট: সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি হুতিদের

সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি বিদ্রোহীরা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে সংঘাত আজ শনিবার নতুন এক ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে এই দাবি করা হয় বলে জানিয়েছে বার্তাসংস্থা এএফপি।

হুতি নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম জানিয়েছে, লোহিত সাগর তীরবর্তী সৌদি শহর জিজানকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জিজান এবং উত্তরের ইয়ানবু এলাকায় সতর্কতা জারি করে।

টেলিগ্রামে আনসারুল্লাহ মিডিয়ার এক পোস্টে বলা হয়, হামলায় জিজানে আগুন লেগেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং এএফপি যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শহরটিতে সৌদি তেল কোম্পানি আরামকোর একটি শোধনাগারের ওপর কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে।

এর আগে শুক্রবার সৌদি আরব হুতি স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানোর পর ইরান সমর্থিত এই গোষ্ঠী রিয়াদের বিরুদ্ধে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা সৃষ্টির’ অভিযোগ তোলে।

ইয়েমেনের একটি নিরাপত্তা সূত্র এএফপিকে জানায়, সৌদি হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল হোদেইদা বন্দরনগরের একটি নৌঘাঁটি এবং কামারান দ্বীপের একটি সামরিক শিবির।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে এটি নতুন একটি ফ্রন্ট হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মিত্রদের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া এই গোলাগুলি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

হোদেইদার বাসিন্দা ফাইজা (৩৬) এএফপিকে বলেন, বিস্ফোরণের শব্দ ‘বজ্রপাতের মতো প্রচণ্ড’ ছিল। তিনটি পৃথক বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন তিনি।

ফাইজা বলেন, ‘আমি বিশ্বাসই করতে চাইনি যে আমরা আবার হামলার দিনগুলোতে ফিরে গেছি।’

এএফপি জানায়, ২০১৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে হুতিরা যুদ্ধ করে আসছে। দীর্ঘ এই সংঘাতে কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়েছে এবং ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।

তবে ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির পর দরিদ্র আরব উপদ্বীপের এই দেশে বড় ধরনের লড়াই অনেকটাই স্থবির ছিল।

চলতি সপ্তাহে হুতিরা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয় এবং লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়।

এই নৌপথের হুমকি এমন এক সময়ে এল, যখন ইরানও হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ বজায় রেখেছে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া বৈরিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি।

শনিবার যুক্তরাজ্যের ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানায়, হরমুজ প্রণালির কাছে একটি তেলবাহী জাহাজ ও অজ্ঞাত সামরিক বাহিনীর মধ্যে নতুন একটি ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।

এদিকে টানা ১৩ রাত বোমাবর্ষণের পর শনিবার প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন কোনো হামলার ঘোষণা দেয়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি এখনো ইরানে বড় ধরনের হামলা চালানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেননি। কারণ, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় তেহরান এখন ‘আরও আন্তরিক’ হয়ে উঠছে।

ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না, এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেখুন, আমরা এখন তাদের সঙ্গে কথা বলছি। আমার মনে হচ্ছে, দিন যত যাচ্ছে তারা ততই সিরিয়াস হচ্ছে, সম্ভবত স্পষ্ট কারণেই।’

ট্রাম্প বলেন, ইরানের সামনে দুটি পথ খোলা—সমঝোতায় পৌঁছানো অথবা আরও ‘উচ্চমাত্রার’ হামলার মুখোমুখি হওয়া। প্রায় দুই সপ্তাহের মার্কিন হামলায় এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে গেছে।

ট্রাম্প একসময় বলেছিলেন, যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী হবে। কিন্তু এখন তা গড়িয়েছে প্রায় পঞ্চম মাসে। আসন্ন নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই যুদ্ধ তার জনপ্রিয়তার ওপরও প্রভাব ফেলছে।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার ‘টার্নিং পয়েন্ট’ কী হবে, তা তিনি জানেন না, বলেন ট্রাম্প।

তবে পুনরায় উল্লেখ করেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়, সেটিই হবে তার ‘রেড লাইন’।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া থেকে ইরানকে বিরত রাখতেই তারা হামলা চালাচ্ছে।

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, এর জবাবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে, যাতে চারজন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। ইরানের সামরিক বাহিনী শুক্রবার দাবি করে, তারা বাহরাইন, জর্ডান ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা বাহরাইনে অ্যামাজনের একটি ডেটা সেন্টারেও হামলা চালিয়েছে। তবে এ দাবির বিষয়ে এখনো অ্যামাজন বা বাহরাইন সরকার কোনো মন্তব্য করেনি।

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও এখন পর্যন্ত তাদের কোনো সামরিক স্থাপনা বা সেনাসদস্যকে লক্ষ্য করে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।

Related Articles

Latest Posts