দক্ষিণ আফ্রিকায় অগ্নিকাণ্ডে ৬ বাংলাদেশি নিহত: ‘সকালে ঘুম ভাঙে ছেলের মৃত্যুর খবরে’

পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান ফাহিম। সেখানে কাটিয়েছেন দীর্ঘ ১০ বছর। চলতি বছর কাগজপত্র ঠিক করে দেশে ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না।

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোরে দক্ষিণ আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলীয় কুইন্সটাউন শহরে একটি সুপারশপে অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন ফাহিম। ওই সুপারশপে তিনি টানা ১০ বছর ধরে কাজ করতেন।  

নিহত ফাহিম (২৮) নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর গ্রামের মনির হোসেনের ছেলে।

ওই সুপারশপটির মালিক রওশন আলী একই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও একই গ্রামের বাসিন্দা।

অগ্নিকাণ্ডে নিহত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনই নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা।

নিহত বাকিরা হলেন—ক্রোকেরচর গ্রামের আলী মিয়ার ছেলে মো. আপন (২৩), নুর মোহাম্মদ (৫৫), বক্তাবলী ইউনিয়নের তৈলখিরার চর এলাকার ফারুক হোসেনের ছেলে মো. ফয়সাল (২৬), কানাইনগর এলাকার মৃত আক্তার হোসেনের ছেলে মো. শাহিন (২৬) ও মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম পৌরসভার কালিন্দিপাড়া গ্রামের মৃত সালাম ব্যাপারীর ছেলে মো. রাজিক (৫৫)।

আজ মঙ্গলবার বিকেলে সরেজমিনে ফাহিমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে চলছে শোকের মাতম। সকালে ফাহিমের মৃত্যুর খবরে ঘুম ভাঙে পরিবারের সদস্যদের।

ঘরের ভেতরে আহাজারি করছিলেন ফাহিমের মা লুৎফুন্নেছা, ছোট দুই বোন মুনমন ও মিম এবং যমজ দুই ভাই জাহিদ ও নাহিদ। স্বজনরা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কান্না থামছিল না। আর পাশের ঘরে নীরবে বসে ছিলেন ফাহিমের বাবা মনির হোসেন।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘আমার আর কিছু বলার নেই। সকালে ঘুম ভাঙল ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে। আমি আর কী কমু!’

ফাহিমের ফুফাতো ভাই মো. আল-আমিন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সুপারশপের কর্মীদের দেখাশোনার দায়িত্বও ছিল ফাহিমের। কাগজপত্রের কাজ শেষ করে কয়েক মাসের মধ্যেই দেশে ফেরার কথা ছিল। পুরো সংসারটাই সেই চালাইত। এত বছর বিদেশে থাকার পর বাড়ি ফিরে বিয়ে করার কথা ছিল। কিন্তু কিছুই হইল না।’

এদিকে, ছেলেকে হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন নিহত মো. আপনের মা আঁখি বেগম। মাত্র ২০ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে চার বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান আপন।

বিলাপ করতে করতে আঁখি বেগম বলেন, ‘আমার পুতেরে আইন্না দেও। তোমরা কেউ আমার পুতেরে আইন্না দেও।’

আপনের বড় ভাই সৌদিপ্রবাসী মো. জুয়েল ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ঘটনার আগের দিনও আপনের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। ওর স্বপ্ন ছিল বাড়িঘর পাকা করবে, তারপর বাবা-মাকে নিয়ে সেই বাড়িতে থাকবে। বাড়ির কাজ ঠিকই চলছে, কিন্তু আমার ভাইয়ের স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।’

তিনি বলেন, ‘যতটুকু শুনছি লাশ পুইড়া ছাই হইয়া গেছে। লাশ আনার কোনো সুযোগ নাই। পোড়া লাশের ছাইটুকুও যদি আমাগোরে আনার ব্যবস্থা কইরা দেয়, তাইলে আমরা একটু কবর  দিতাম।’

নিহত নূর মোহাম্মদের বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। খাটের ওপর বসে আহাজারি করছিলেন তার তিন বোন রঙমালা, আরিফা ও কনিকা। অন্য একটি ঘরে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন তার স্ত্রী কামরুন্নাহার।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০১৯ সালে জীবিকার সন্ধানে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান নূর মোহাম্মদ। এর আগে কয়েক বছর সিঙ্গাপুরে চাকরি করেছেন তিনি। তার আয়ে দুই মেয়ে সায়মা ও সাদিয়ার বিয়ে দিয়েছেন। ছোট ছেলে সিয়াম এখন এইচএসসি পরীক্ষার্থী।

নূর মোহাম্মদের ভাগনি ফিমা ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মামা দেশে ফিরে আসার পরিকল্পনা করছিলেন। আগের দিনও কাগজপত্র ঠিক করতে গিয়েছিলেন। জীবনের বড় একটা সময় বিদেশেই কেটেছে তার। কিন্তু দেশে ফেরা আর হলো না।’

 

Related Articles

Latest Posts