পেয়ারার জন্য বিখ্যাত পিরোজপুরের নেছারাবাদ ও পার্শ্ববর্তী ঝালকাঠি সদর উপজেলার বাগানগুলোতে এবার ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। ভরা মৌসুমে যেখানে বাজারে পেয়ারার সরবরাহ বেড়ে দাম কমে যায়, সেখানে চলতি বছরে উৎপাদন কমেছে। ফলে সরবরাহ কমে ভালো মানের পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে রেকর্ড দামে। আকার ও মানভেদে প্রতি মণ পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে এক হাজার টাকারও বেশি দরে।
চাষিরা জানান, পেয়ারা সংগ্রহের ভরা মৌসুম শুরু হয়েছে প্রায় তিন সপ্তাহ আগে। এই মৌসুম আরও দেড় মাস চলবে। বিগত বছরগুলোতে মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পেয়ারা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। তবে ভরা মৌসুমে দাম নেমে আসে ৪০০ টাকা বা তারও নিচে। কিন্তু এ বছর ফলন কমায় পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে অস্বাভাবিক বেশি দামে।
চাষিদের মতে, গাছে ফুল আসার সময় প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এবার ফলন কমেছে।
তাদের ভাষ্য, কেবল এবার না গত কয়েক বছর ধরেই পেয়ারার ফলন কমছে। তবে যতটুকু তারা স্মরণ করতে পারেন, এ বছর উৎপাদন হয়েছে সবচেয়ে কম। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবার গাছে পেয়ারা হয়েছে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার শতদাশকাঠী গ্রামের কৃষক অরুণ মজুমদার জানান, ভরা মৌসুমে সাধারণত গাছে এত বেশি পেয়ারা থাকে, বেশিরভাগ সময় সব ফল সংগ্রহ করাও সম্ভব হয় না। ফলে অনেক পাকা পেয়ারা গাছেই নষ্ট হয় কিংবা মাটিতে ঝরে পড়ে। কিন্তু এ বছরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
অরুণ মজুমদার বলেন, ‘এবার বাগানে খুবই অল্প পরিমাণ ফল আছে। ফলের স্বল্পতার কারণেই বর্তমানে স্বাভাবিকের তুলনায় পেয়ারার দাম বেশি।’
চাষিরা জানান, এ বছর অন্তত অর্ধেক পেয়ারায় ছিদ্র বা কালো দাগ দেখা দিয়েছে। ফলে এসব পেয়ারা বাজারে বিক্রির অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
একই গ্রামের বাদল মিস্ত্রি জানান, ফলের ক্ষতির কারণে সংগ্রহ করা পেয়ারার মাত্র অর্ধেক বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা পেয়ারা বাগানে কীটনাশক ব্যবহার করাও কঠিন ও ব্যয়বহুল।
অনুপ হালদার নামের আরেক চাষি জানান, ভরা মৌসুমে প্রতিদিন বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু এ বছর ফলন মারাত্মক কমায় প্রতি বাগান থেকে ফল সংগ্রহের জন্য অন্তত দুই দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
অবশ্য ফলন কম হলেও পুরো মৌসুমজুড়ে ভালো দাম পাওয়ায় চাষিরা খুশি বলে জানান তিনি।
পেয়ারার উৎপাদন কমার প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়ীদের ওপরও। স্থানীয় কমিশন এজেন্ট গৌতম হালদার জানান, প্রতিবছর পাইকারি ক্রেতাদের পেয়ারা কিনতে সহযোগিতা করে তিনি ভালো আয় করেন। তবে এ বছর ফলন এতটাই কম যে, ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পেয়ারা সরবরাহ করতে পারছেন না।
পটুয়াখালী থেকে আসা পাইকারি ক্রেতা জাকির হোসেন মোল্লা বলেন, এ বছর বাজার পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে গেছে। বিগত বছরে চাষিরা পেয়ারা কেনার জন্য তাদের অনুরোধ করতেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি এমন যে, পেয়ারা বিক্রির জন্য চাষিদের কাছে তাদেরই অনুরোধ করতে হচ্ছে। ফলে এক ট্রাক ভর্তি করার মতো পর্যাপ্ত পেয়ারা সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
পেয়ারা সংগ্রহের মৌসুমে প্রতিবছর নেছারাবাদ ও ঝালকাঠি সদর উপজেলার বিভিন্ন পাইকারি হাটে বড় বড় পণ্যবাহী ট্রলার ও রাস্তাজুড়ে সারি সারি ট্রাক দেখা যায়। কিন্তু এ বছর বিভিন্ন হাট ঘুরে হাতে গোনা কয়েকটি ট্রাক ও পিকআপভ্যান দেখা গেছে।
জানতে চাইলে নেছারাবাদ উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. নুরুন নবী, উৎপাদন কম হলেও চাষিরা ভালো দাম পাচ্ছেন। ফলন কমায় এবার পেয়ারার মৌসুম নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়ে যেতে পারে।
তিনি জানান, ছত্রাকজনিত অ্যানথ্রাকনোজ, বিটল পোকা ও ফলের মাছির আক্রমণে পেয়ারায় গুটি বা কালো দাগ হয়। কৃষকেরা এসব দমনের জন্য কোনো ধরনের কীটনাশক ব্যবহার না করায় এসব রোগ ও পোকার আক্রমণে পেয়ারা নষ্ট হচ্ছে।
এদিকে নেছারাবাদ ও ঝালকাঠি সদর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর নেছারাবাদে ৬০০ হেক্টর ও ঝালকাঠি সদর উপজেলায় ২৯৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়েছে।
এই দুই উপজেলার প্রধানত আটঘর-কুড়িয়ানা, জলাবাড়ি, কীর্ত্তিপাশা ও নবগ্রাম ইউনিয়নে পেয়ারা উৎপাদিত হয়। দক্ষিণাঞ্চলের এই দুই উপজেলার উৎপাদিত পেয়ারা ট্রাক, পিকআপভ্যান এবং মাঝেমধ্যে বড় ট্রলারে করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়।
