বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের হতাশাজনক বিদায়ের পর সমালোচনার তীর ছুটে এসেছে প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তির দিকে। কৌশল, দল নির্বাচন থেকে শুরু করে ব্রাজিলের খেলার ধরন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সমর্থক ও বিশ্লেষকরা। তবে সব সমালোচনার জবাবে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন ইতালিয়ান এই কোচ।
আনচেলত্তির মতে, বর্তমান ব্রাজিল দলে স্পেনের মতো বল দখলে রেখে খেলার জন্য প্রয়োজনীয় মানের মিডফিল্ডারই নেই। তাই স্পেনকে অনুকরণ না করে নিজেদের শক্তির ওপর ভিত্তি করেই খেলা উচিত সেলেসাওদের।
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ১৯৯০ সালের পর এবারই প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয় ব্রাজিল। নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে জোড়া গোল করে ব্রাজিলের স্বপ্ন ভেঙে দেন নরওয়ের তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড।
এই হারের পর সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হন আনচেলত্তি। মাত্র এক বছর আগে ব্রাজিলের দায়িত্ব নেওয়া এই কোচের কৌশল ও একাদশ নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে ব্রুনো গিমারেসেকে পেনাল্টি নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া, যেখানে তিনি ব্যর্থ হন, এবং ৩৪ বছর বয়সী কাসেমিরো ও দানিলোকে পুরো ম্যাচ খেলানোর সিদ্ধান্ত সমালোচনার জন্ম দেয়। ম্যাচের শেষ দিকে ব্রাজিলের মিডফিল্ডে শক্তি, সৃজনশীলতা ও গতিশীলতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পরিসংখ্যানও ব্রাজিলের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে ব্রাজিলের বল দখলের হার ছিল মাত্র ৩৪ শতাংশ। ১৯৬৬ সাল থেকে এই পরিসংখ্যান রাখা শুরু হওয়ার পর বিশ্বকাপে এটি ছিল ব্রাজিলের সর্বনিম্ন বল দখলের রেকর্ড। তবে আনচেলত্তির মতে, শুধু বল দখলের পরিসংখ্যান দিয়ে একটি দলের পারফরম্যান্স বিচার করা ঠিক নয়।
ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম জি ই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, একটি দলের খেলার ধরন নির্ধারণ করা উচিত খেলোয়াড়দের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী। অনেকে সমালোচনা করছে, কারণ নরওয়ের চেয়ে আমাদের বল দখল কম ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের দলের গঠন এবং খেলোয়াড়দের বৈশিষ্ট্য বল দখলে রেখে খেলার জন্য উপযুক্ত নয়।’
বর্তমান ব্রাজিল দলের সবচেয়ে বড় শক্তি দ্রুত আক্রমণ বলে জানান আনচেলত্তি, ‘যখন আপনার সামনে ভিনিসিয়ুস, এন্দ্রিক, এস্তেভাও এবং রাফিনিয়ার মতো ফুটবলার থাকে, তখন বল দখলে রেখে খেলার প্রয়োজন নেই। বরং আরও সরাসরি এবং দ্রুতগতির ফুটবল খেলতে হবে।’
তবে ভবিষ্যতে যদি বিশ্বমানের কোনো মিডফিল্ডার উঠে আসে, তাহলে খেলার ধরনও পরিবর্তন হতে পারে বলে জানান তিনি, ‘খেলার ধরন সবসময় খেলোয়াড়দের ওপর নির্ভর করে। যদি ভবিষ্যতে খুব উচ্চমানের কোনো মিডফিল্ডার আসে, তাহলে অবশ্যই আমরা বল দখলে রেখে খেলার কথা ভাবতে পারি।’
স্পেনের উদাহরণ টেনে ব্রাজিল কোচ বলেন, বল দখলের ফুটবল কোনো দর্শন নয়, বরং সঠিক খেলোয়াড় থাকলেই সেটি সম্ভব। তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপজয়ী স্পেনের বল দখল বেশি ছিল, কারণ তাদের কাছে অসাধারণ এক প্রজন্মের মিডফিল্ডার রয়েছে। ফাবিয়ান রুইস, রদ্রি, পেদ্রি, দানি ওলমো, মার্তিন জুবিমেন্দি, মিকেল মেরিনো এবং গাভিএ মতো বিশ্বমানের সাতজন মিডফিল্ডার রয়েছে তাদের। তাই তারা ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে এবং বিশ্বকাপ জিতেছে।’
ব্রাজিলের সমর্থকদের কি ভবিষ্যতেও কম বল দখল করে খেলতে অভ্যস্ত হতে হবে, এমন প্রশ্নের জবাবেও একই অবস্থানে থাকেন আনচেলত্তি, ‘অনেক ম্যাচে বল দখল কম থাকাটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিষয়টি নির্ভর করে খেলোয়াড়দের বৈশিষ্ট্যের ওপর। যখন দলে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, এন্দ্রিক এবং এস্তেভাওয়ের মতো গভীরে দৌড়ে আক্রমণ করা ফুটবলার থাকে, তখন আরও সরাসরি ফুটবল খেলতে হয়। স্পেনের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। লামিন ইয়ামাল ছাড়া তাদের সামনে এমন গতিময় খেলোয়াড় নেই। তাদের অন্যরা মূলত ছোট ছোট পাসের সমন্বয়ে খেলা গড়ে তোলে।’
