হঠাৎই হাজারো অভিবাসনপ্রত্যাশীর ঢল নামে স্পেন সীমান্তে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্থল ও সমুদ্রপথে স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় প্রবেশ করছেন তারা।
সেউতার নেতা জুয়ান জেসুস ভিভাস জানিয়েছেন, প্রায় ৮০ হাজার মানুষের ছোট এই ভূখণ্ডে গত কয়েকদিনে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ প্রবেশ করেছে।
কিন্তু হঠাৎ কেন স্পেন সীমান্তে হাজারো মানুষের ঢল? আজ শুক্রবার বার্তাসংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয় এর কারণ।
এতে বলা হয়, আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপের দুটি স্থলসীমান্তের একটি হলো সেউতা শহর। মাত্র ১৮ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটারের এই শহরটি উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত হলেও এটি স্পেনের অংশ। তাই সেউতায় প্রবেশের অর্থ হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ডে পৌঁছানো।
এই শহর থেকে জিব্রাল্টার প্রণালি পার হলেই ইউরোপ।
উন্নত জীবনের আশায় আফ্রিকার দেশগুলো থেকে অনেকেই ইউরোপে যাওয়ার সুযোগের সন্ধানে থাকেন।
মরক্কোর ফাতিমা জাহরা এএফপিকে বলেন, ‘স্পেন ও মরক্কোর মধ্যকার সেউতা সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে—সকালে ঘুম থেকে উঠেই এমন খবর কানে আসে। তানজিয়ারে ছিলাম আমি, সেখানে আমার সঙ্গে থাকা লোকজনকে বললাম, চলো সেউতায় যাই। ভাগ্যটা বদলানোর চেষ্টা করে দেখি।’
ইউরোপে যেতে চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে জাহরা বলেন, ‘এখানে ভয়াবহ পরিবেশে কাজ করতে হয়।’
তবে শেষ পর্যন্ত ইউরোপের মাটিতে পৌঁছাতে পারেননি জাহরা। মরক্কো সীমান্তে নিরাপত্তাবাহিনীর ধাওয়া খেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন তিনি।
Migrants flood into Spain’s Ceuta exclave from Morocco.
Madrid says it will despatch soldiers to Ceuta to ensure security after thousands of migrants entered Spain’s north African exclave from neighbouring Morocco and hundreds more are headed there pic.twitter.com/A9oaQ4OCu7
— AFP News Agency (@AFP) July 31, 2026
সীমান্ত থেকে ফেরত আসা আরেক অভিবাসনপ্রত্যাশী করিম বলেন, ‘হঠাৎ শুনলাম কয়েকজন সফলভাবে সেউতায় ঢুকেছেন। তখন আমিও সাহস নিয়ে সীমান্তে যাই। আমার মতো আরও অনেকে একই খবর শুনে সীমান্তে জড়ো হয়েছেন।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরোপে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে—এমন খবর শুনে মারাকেশ ও কেনিত্রার মতো দূরের শহর থেকেও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সীমান্তে এসেছিলেন কেউ কেউ।
এএফপি জানায়, হাজারো মানুষের এই ঢলে সীমান্তে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দৃশ্যত ভেঙে পড়ে। এরপরই সেউতা শহরে ঢুকতে থাকে মানুষ।
গণমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে, ইউরোপীয় ভূখণ্ডে প্রবেশের পর কয়েকজন তরুণ বিজয়সূচক ‘ভি’ চিহ্ন দেখাচ্ছেন। শহরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তারা বলছেন, ‘বিদায় মরক্কো, স্বাগত স্পেন।’ এদের মধ্যে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীও রয়েছে।
এএফপি জানায়, সেউতায় স্প্যানিশ পুলিশকে খুব একটা হস্তক্ষেপ করতে দেখা যায়নি।
তবে বৃহস্পতিবার রাত থেকেই সীমান্তে কঠোর অবস্থান নিয়েছে মরক্কো পুলিশ। জড়ো হওয়া মানুষদের সরিয়ে দিতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করছে তারা।
Migrants broke through fences and swam into Spain’s North African enclave of Ceuta from Morocco, overwhelming the police and prompting Madrid to deploy the military as tens and thousands of migrants were estimated to have crossed illegally https://t.co/bX4Fas0v2i pic.twitter.com/TQVUL8Owh8
— Reuters (@Reuters) July 31, 2026
অন্যদিকে, রয়টার্স জানায়, চলতি মাসের শুরুতে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে বলা হয়, সমুদ্রে আটক অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কোনো প্রক্রিয়া ছাড়াই সরাসরি সেউতা বা মেলিয়ার সীমান্ত দিয়ে ফেরত পাঠানো যাবে না।
সীমান্তে এই হঠাৎ ভিড়ের পেছনে এটিও অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে রয়টার্স।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, কাঁটাতারের বেড়া ও সাঁতরে সমুদ্র পার হওয়ার সময় এ পর্যন্ত মারা গেছে ৫৭ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করেছে স্পেন।
সেউতার নেতা ভিভাস জানান, সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সময় ভিড়ের মধ্যে চাপা পড়ে মারা গেছেন অনেকে। সাগর পাড়ি দিতে গিয়েও মৃত্যু হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে এও বলা হয়, শুক্রবার পর্যন্ত ২৫ হাজারের বেশি মানুষ স্বেচ্ছায় স্পেন ছেড়ে মরক্কোয় ফিরে গেছেন।
এএফপিকে পাঠানো এক বার্তায় স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৩১ জুলাই ভোর থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজারের বেশি অভিবাসী সেউতা থেকে মরক্কোর উদ্দেশে চলে গেছেন।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, মরক্কো অংশে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বড় বড় দলকে ঠেকানোর চেষ্টা করছেন স্পেনের নিরাপত্তাকর্মীরা।
রাতভর ফনিদেক শহরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখা গেছে। সেখানে হাজারো অভিবাসনপ্রত্যাশী জড়ো হয়েছিলেন। অনেকে দলবদ্ধভাবে সীমান্ত ফটকের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেছেন। বাধা দিলে নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে সংঘর্ষও হয়। এ সময় বেশ কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
অন্তত আটটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার তথ্য পেয়েছে রয়টার্স।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সেউতায় সশস্ত্র বাহিনীর ও সিভিল গার্ডের সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দেয় দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে শুক্রবার সেউতা সফর করেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। সঙ্গে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা।
চলমান পরিস্থিতি ‘অপ্রত্যাশিত’ উল্লেখ করে সানচেজ বলেন, ‘সেউতার নিরাপত্তাকে মাদ্রিদের নিরাপত্তার মতোই গুরুত্ব দিয়ে রক্ষা করা হবে।’
তিনি জানান, গত বছর স্পেনে অবৈধ অভিবাসন প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছিল। ফলে বর্তমানে যা ঘটছে, তা আগের ধারার সম্পূর্ণ বিপরীত।
মরক্কোয় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ফেরত পাঠাতে কত সময় লাগতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে সানচেজ বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব।’
মরক্কোর সঙ্গে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ আলোচনা করেছে এবং অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে মরক্কো রাজি হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনের স্পেনের বিদ্যমান আইনে পরিবর্তন আনা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢল নামার পর ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যেও মতবিরোধও দেখা দিয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ে মরক্কোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
স্পেনের সঙ্গে সীমান্তে তল্লাশি জোরদার করেছে ফ্রান্স। ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের মাধ্যমে স্পেনকে সহায়তা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ।
অন্যদিকে ইতালি ও ডেনমার্ক হুমকি দিয়ে বলেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে ইইউর অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত সীমান্তব্যবস্থা থেকে স্পেনকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য ইউরোপীয় নেতাদের একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
উত্তর আফ্রিকার মরক্কোর ভূখণ্ডে অবস্থিত সেউতা ও মেলিয়া স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত শহর। আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত রয়েছে এই দুই শহর ঘিরে। ফলে আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশ করতে চাওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই সেউতা ও মেলিয়া গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ।
