নেপালের দক্ষিণাঞ্চলীয় তরাই-মধেশ অঞ্চলে স্থানীয় ধর্মীয় বিরোধ কয়েক দিনের ব্যবধানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। এতে দেশটির দীর্ঘদিনের ধর্মীয় সম্প্রীতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতের তাৎক্ষণিক সূত্রপাত স্থানীয় এক বিরোধ থেকে হলেও এর পেছনে রয়েছে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় মেরুকরণ, সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বাড়তে থাকা অবিশ্বাস, প্রশাসনের ঢিলেমি এবং বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক সংকট।
যেভাবে সংঘাতের শুরু
ভারতের গণমাধ্যম দ্য হিন্দু জানিয়েছে, গত ২৬ জুলাই রাতে কোশি প্রদেশের সুনসারি জেলার দেওয়ানগঞ্জ গ্রামীণ পৌরসভার কাপ্তানগঞ্জ এলাকায় হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে এবং পুলিশ হস্তক্ষেপ করে।
পুলিশের গুলি ও পরবর্তী বিক্ষোভে অন্তত তিনজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ওমপ্রকাশ মেহতা (৩১), জয়প্রকাশ মেহতা (২১) ও গণেশ যাদব (১৫)। ওমপ্রকাশ মেহতার মৃত্যুর পর বিক্ষোভ দ্রুত সুনসারি ছাড়িয়ে সারলাহি, ধনুষা, সিরাহা ও সপ্তরিসহ একাধিক জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারফিউ জারি এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
মুসলিমরা নেপালের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ হলেও মধেশ ও কোশি প্রদেশের ভারত সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে তাদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। দীর্ঘদিন ধরে এসব এলাকায় হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে এলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছোটখাটো বিরোধও বড় সংঘাতে রূপ নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ঢিলেমি নিয়ে সমালোচনা
সহিংসতা শুরুর কয়েক দিন পর প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। এর আগে তিনি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানানোয় বিরোধীদের সমালোচনার মুখে পড়েন।
ভাষণে তিনি নাগরিকদের শান্ত ও সংযত থাকার আহ্বান জানান এবং গুজব, ভুয়া তথ্য ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে বলেন।
তিনি বলেন, সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে ধর্ম পালনের অধিকার দিয়েছে এবং সরকার সেই অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে যারা সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও ঘোষণা দেন।
শুধু ধর্মীয় সংঘাত নয়, রয়েছে গভীর সংকট
নেপালের রাজনৈতিক বিশ্লেষক চন্দ্রকিশোরের মতে, সাম্প্রতিক সহিংসতাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বহু বছর ধরে নেপালের সমাজে যে ধর্মীয় সহাবস্থানের সংস্কৃতি ছিল, তা দুর্বল হয়ে পড়ছে। হিন্দুদের মধ্যে সন্দেহ এবং মুসলমানদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়ছে। এই অবিশ্বাস দূর না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংঘাত ঘটতে পারে।
জনকপুরভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নর্থ-সাউথ কালেকটিভসের নির্বাহী পরিচালক রাকেশ মিশ্র বলেন, সাম্প্রতিক সহিংসতাকে কেবল হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
তার মতে, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ক্রমবর্ধমান প্রভাব, ভারতের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রভাব এবং পুলিশের সঙ্গে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পরে সেটি সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে রূপ নেয়।
জনকপুরের বাসিন্দা রাকেশ শাহের মতে, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক সংকট এবং তরুণদের হতাশাও সমাজে অস্থিরতা বাড়িয়েছে। এসব অসন্তোষকে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ধর্মীয় আবেগ উসকে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করছে বলেও ধারণা তার।
হিন্দু রাষ্ট্র ইস্যুতে বিতর্ক
সহিংসতার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে যে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং হিন্দু সংগঠনগুলোর সঙ্গে ১৩ দফার একটি চুক্তি করেছেন, যার মধ্যে নেপালকে আবার হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে সর্বদলীয় আলোচনা শুরুর কথাও রয়েছে।
তবে ধনুষার প্রধান জেলা কর্মকর্তা প্রেম প্রসাদ লুইন্টেল এ দাবি নাকচ করে বলেন, সরকারের সঙ্গে কোনো চুক্তি হয়নি। বিভিন্ন সংগঠন কেবল তাদের দাবিসংবলিত স্মারকলিপি সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। পরে ‘হিন্দু সম্রাট সেনা’সহ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোও জানায়, সরকারের সঙ্গে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা হয়নি।
পরবর্তী বৈঠকে হিন্দু সংগঠনগুলো ছয় দফা দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরে। তারা ধর্মীয় শোভাযাত্রায় অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ করা, ধর্মীয় স্থাপনায় লাউডস্পিকারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং হিন্দু রাষ্ট্র ইস্যুতে রাজনৈতিক আলোচনা শুরুর দাবিও জানায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব দাবি বিবেচনার আশ্বাস দেন। সরকার জানিয়েছে, নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানো ঠেকাতে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
অতীতে সংলাপেই মিলেছে সমাধান
দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শুধু কারফিউ বা পুলিশি ব্যবস্থায় নয়, তরাই-মধেশ অঞ্চলে অতীতের প্রায় সব সাম্প্রদায়িক সংকটের স্থায়ী সমাধান এসেছে রাজনৈতিক সংলাপ, স্থানীয় নেতৃত্বের সক্রিয় ভূমিকা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে।
২০২২ সালে মহোত্তরির পারারিয়া, ২০২৩ সালে সারলাহির মালাঙ্গাওয়া, ২০২৪ সালে সুনসারির হরিনগর এবং ২০২৫ সালে ধনুষার দেবপুরা রূপাইঠাসহ বিভিন্ন এলাকায় ধর্মীয় শোভাযাত্রা, পতাকা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজবকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় নেতা, নিরাপত্তা বাহিনী ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগে সেসব সংকট দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, দেওয়ানগঞ্জে শুরুতেই সেই সমন্বয় গড়ে না ওঠায় একটি ছোট বিরোধ বড় সংকটে পরিণত হয়। নিহতদের পরিবার ছয় দিন পর্যন্ত মরদেহ গ্রহণ করেনি, বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল এবং উত্তেজনা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তৎপর না হওয়ার অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এখন যা হচ্ছে
সরকার ইতোমধ্যে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে। নিহত ওমপ্রকাশ মেহতা ও জয়প্রকাশ মেহতাকে শহীদ ঘোষণার প্রক্রিয়া শুরু এবং তাদের পরিবারকে ১০ লাখ নেপালি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এদিকে সুনসারি, ধনুষা ও আশপাশের জেলাগুলোতে সর্বদলীয় বৈঠক, সম্প্রীতি সমাবেশ এবং যৌথ শান্তির আহ্বান অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় নেতা, নাগরিক সমাজ ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিনিধিরা একসঙ্গে কাজ করছেন যাতে নতুন করে উত্তেজনা না ছড়ায়।
মানবাধিকারকর্মী, নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং স্থানীয় নেতাদের অভিন্ন মত, সহিংসতা সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে শান্তি ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন দ্রুত সংলাপ, রাজনৈতিক সংযম, স্থানীয় নেতৃত্বের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন।
তাদের মতে, দেওয়ানগঞ্জের সাম্প্রতিক সংকট আবারও প্রমাণ করেছে, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার টেকসই সমাধান কেবল শক্তি প্রয়োগে নয়, বরং বিশ্বাস, সংলাপ ও সমন্বয়ের মধ্যেই নিহিত।
