চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট ব্যয় মেটাতে প্রতি ১০টি পরিবারের প্রায় ৯টিকেই ঋণ নিতে হয়েছে এবং ১০টির মধ্যে ৬টি পরিবার তাদের সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছে বলে নতুন এক জরিপে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি) যৌথভাবে এই জরিপ করেছে।
জরিপে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হলেও হামের প্রাদুর্ভাবের আর্থিক প্রভাব হাসপাতালের চিকিৎসার বাইরেও অনেকদূর বিস্তৃত।
হাম সংশ্লিষ্ট কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৪০০টি পরিবারের একেকটি পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে জরুরি নগদ সহায়তার জন্য নির্বাচন এবং এই সংকটের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে এই জরিপটি পরিচালনা করে বিডিআরসিএস-আইএফআরসি।
মে ও জুন মাসে ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া হামে আক্রান্ত ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারের ওপর জরিপটি চালানো হয়। এতে দেখা যায়, চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট ব্যয় মেটাতে ২ হাজার ৪৪২টি পরিবার, অর্থাৎ ৮৮ দশমিক ৯ শতাংশকে ঋণ নিতে হয়েছে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, অন্তত ১ হাজার ৬৭০টি পরিবার বা ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ তাদের সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছে। আর ১১২টি পরিবার বা ৪ দশমিক ১ শতাংশকে সম্পদ বিক্রি করতে হয়েছে। অন্যদিকে ৯০টি পরিবার বা ৩ দশমিক ৩ শতাংশ আর্থিক চাপ সামাল দিতে অনুদানের ওপর নির্ভর করেছে।
হামের প্রাদুর্ভাবে ঋণের বোঝা কাঁধে পড়া পরিবারগুলোর একটি নাজমা বেগমের পরিবার।
গত মাসে দ্য ডেইলি স্টার যখন রাজধানির ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে যায়, যেখানে শুধু হাম রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়; সেখানে চিকিৎসাধীন ছিল নাজমার ১০ মাস বয়সী মেয়ে আশিয়া।
শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার গৃহিণী নাজমা বলেন, প্রথমে তার মেয়ের প্রচণ্ড জ্বর আসে। পরে স্থানীয় এক চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘পরে তাকে ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা হাম শনাক্ত করে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন।’
নাজমার স্বামী একজন রাজমিস্ত্রি। নিয়মিত কাজ পান না। নাজমা বলেন, ‘মেয়েকে চিকিৎসার জন্য এখানে আনতে আমাদের ঋণ নিতে হয়েছে।’ তবে কত টাকা ঋণ নিয়েছেন, তা তিনি জানাননি।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ লাখ ৪৪ হাজার মানুষ, যাদের বেশির ভাগই শিশু, হাম বা হামের মতো উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ৩১ জুলাই পর্যন্ত হাম-সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮১০ জনে।
গত পাঁচ মাসে দ্য ডেইলি স্টার ঢাকার তিনটি প্রধান হাম চিকিৎসাকেন্দ্র—ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতাল, সংক্রামক রোগ হাসপাতাল (আইডিএইচ) এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন কয়েক ডজন শিশুর অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের মধ্যে ছিলেন নাজমাও। সবার অভিজ্ঞতায় একটি মিল পাওয়া গেছে।
অনেক পরিবারই স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে জটিলতা সামাল দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় রাজধানীতে এসেছে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অভিভাবক জানিয়েছেন, সন্তান হামে আক্রান্ত হওয়ার আগেই অন্য রোগের চিকিৎসায় তাদের সঞ্চয় শেষ হয়ে গিয়েছিল।
মে মাসে ফারজানা আক্তার দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তার পাঁচ মাস বয়সী মেয়ে সাদিকা নূর সাফা জলবসন্তে আক্রান্ত হলে প্রথমে শ্রীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। এতে চিকিৎসার পেছনে তাদের প্রায় ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়।
শিশুটি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার মাত্র ১০ দিনের মাথায় আবার হামে আক্রান্ত হয়। এতে চিকিৎসার জন্য পরিবারটিকে আবারও ঢাকায় আসতে হয়।
ফারজানা ও নাজমার মতো আক্রান্ত বেশির ভাগ পরিবারই ছিল নিম্নআয়ের। তাদের জন্য স্বাস্থ্যসংকট দ্রুতই আর্থিক সংকটে পরিণত হয়। ঢাকায় চিকিৎসার খরচ জোগাতে অনেককেই আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী বা অনানুষ্ঠানিক ঋণদাতার কাছ থেকে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, খাবার ও অন্যান্য খরচ মেটাতে টাকা ধার নিতে হয়েছে।
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট ব্যয়—বিশেষ করে খাবার, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাতায়াত সাধারণত ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মতো হয়ে থাকে। আর যেসব শিশুর বেসরকারি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন হয়, তাদের চিকিৎসা ব্যয় কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
বিডিআরসিএস ও আইএফআরসির জরিপে বলা হয়েছে, পরিবারের সদস্যরা শুধু চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের চাপই সামলায়নি, অসুস্থ সন্তানের সেবাযত্ন করতে হাসপাতালে থাকার কারণে অনেকেই মজুরি হারিয়েছেন, এমনকি জীবিকার উৎসও হারিয়েছেন।
মূল্যায়নে বলা হয়, আক্রান্ত অধিকাংশ পরিবারই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। ফলে তাদের জন্য আর্থিক চাপ আরও তীব্র। চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের গড় প্রায় ১৬ হাজার টাকা, যা যাতায়াত, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অন্যান্য দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় খরচসহ সর্বোচ্চ ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৩৫ শতাংশ উত্তরদাতার কাছে ওষুধ ছিল সবচেয়ে জরুরি চাহিদা। এরপর ছিল নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি-সংক্রান্ত সহায়তা (৩৩ শতাংশ) এবং খাদ্য সহায়তা (২২ শতাংশ)।
যেসব পরিবার তাদের পেশার তথ্য দিয়েছে, তাদের ৭৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। তাদের মাসিক আয় ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় আয় হারানোর ঝুঁকিতে তারা সবচেয়ে বেশি রয়েছে বলে জরিপে উঠে এসেছে।
মাদারীপুরের ব্যাটারিচালিত রিকশাভ্যানচালক টিটু নাকতি এর আগে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, হামে আক্রান্ত ১১ মাস বয়সী ছেলের চিকিৎসার জন্য ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে থাকতে গিয়ে তিনি আয় হারিয়েছেন। চিকিৎসার খরচ চালাতে প্রতিবেশীর কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা ধারও নিতে হয়েছে। সেই ঋণের জন্য তাকে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা সুদ দিতে হচ্ছে।
বিডিআরসিএসের মহাসচিব কবির এম আশরাফ আলম বলেন, ‘আক্রান্ত পরিবারগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝা এবং জরুরি নগদ সহায়তার জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করতেই এই মূল্যায়ন করা হয়েছে।’
লিখিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এই মূল্যায়নে দেখা গেছে, অনেক পরিবার শুধু স্বাস্থ্যসংকট নয়, তীব্র আর্থিক সংকটেরও মুখোমুখি হয়েছে।’
বাংলাদেশে আইএফআরসির হেড অব ডেলিগেশন আলবার্তো বোকানেগ্রা বলেন, ‘হামের এই জরুরি পরিস্থিতির প্রভাব হাসপাতালের দরজায় শেষ হয়নি। অসুস্থ শিশুদের সেবা দিতে গিয়ে বহু পরিবার অসহনীয় আর্থিক সংকটে পড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এই জরিপের ফলাফল জনস্বাস্থ্যের যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা এবং আরও শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক শফিউন নাহিন শিমুল বলেন, এই জরিপের ফলাফল অর্থনীতিবিদদের ভাষায় ‘বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয়ের’ একটি ক্লাসিক উদাহরণ। তার সতর্কবার্তা, হামের প্রাদুর্ভাব এমনিতেই ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে আরও গভীর দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘যখন কোনো পরিবারের আয়ের তুলনায় স্বাস্থ্য ব্যয় অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেড়ে যায়, তখন মানুষকে সঞ্চয় শেষ করতে, সম্পদ বিক্রি করতে কিংবা ঋণ নিতে হয়। এই জরিপে ঠিক সেটিই উঠে এসেছে।’
তিনি বলেন, এই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। এসব পরিবারে অপুষ্টির হার বেশি এবং শিশুদের মধ্যে গুরুতর হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকিও বেশি।
শিমুল বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পুরোপুরি বিনামূল্যের নয়।
তার ভাষায়, ‘হাসপাতালে সব প্রয়োজনীয় ওষুধ, বিশেষ করে ব্যয়বহুল ওষুধ, সব সময় সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। ফলে রোগীদের ওষুধ কিনতে হয়। এ ছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাতায়াত, থাকার ব্যবস্থা এবং রোগীর সঙ্গে থাকা স্বজনের খাবারের খরচও রয়েছে।’
তিনি বলেন, বেশির ভাগ রোগী গ্রামাঞ্চল থেকে আসে। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা দুজনকেই একসঙ্গে ঢাকায় আসতে হয়, ফলে ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য জরুরি তহবিল বা চিকিৎসা সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করে শিমুল বলেন, এমন সহায়তা না থাকলে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠার পরও এই আর্থিক ক্ষতির প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে থেকে যেতে পারে।
