ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বহুল বিতর্কিত বিশ্বকাপ বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির পরিকল্পনা বাতিলের সিদ্ধান্তকে ‘অবশ্যই প্রয়োজনীয়’ বলে মন্তব্য করেছেন আর্সেনালের সাবেক কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গার। একই সঙ্গে ফিফার অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
ফিফার প্রধান বৈশ্বিক ফুটবল উন্নয়ন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ওয়েঙ্গার মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানান, ইনফান্তিনোর পরিকল্পনায় তিনি কোনোভাবেই যুক্ত ছিলেন না। বরং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকেই প্রথমবারের মতো এ প্রকল্পের বিষয়ে জানতে পারেন তিনি।
ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা ছিল ফিফার প্রস্তাবিত ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলে দেওয়া। এর মাধ্যমে বিপুল অর্থ সংগ্রহ এবং বিশ্বকাপ ও অন্যান্য বড় প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্য ছিল ফিফার।
তবে পরিকল্পনাটি প্রকাশ্যে আসার পরই বিশ্ব ফুটবলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। উয়েফাসহ তিনটি মহাদেশীয় ফুটবল কনফেডারেশন এর বিরোধিতা করে। এমনকি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রতিযোগিতা বয়কটের হুমকিও দিয়েছিল উয়েফা। শেষ পর্যন্ত ব্যাপক চাপের মুখে পরিকল্পনাটি বাতিল করেন ইনফান্তিনো।
ওয়েঙ্গার বলেন, ‘ফিফার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আমার পক্ষ থেকে কিছু বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আমি ফিফার প্রধান বৈশ্বিক ফুটবল উন্নয়ন কর্মকর্তা। আমার দলকে নিয়ে আমি খেলার তথ্য বিশ্লেষণ, ফিফার অনলাইন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, প্রয়োজনীয় দেশগুলোতে ৬০টি একাডেমির মাধ্যমে তরুণদের শিক্ষা এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুব প্রতিযোগিতার মতো কার্যক্রম তদারকি করি।’
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি আরও বলেন, ‘এর পাশাপাশি আমি আইএফএবির কারিগরি উপদেষ্টা। এই কৌশলগত পরিকল্পনার সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম না এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকেই প্রথম প্রকল্পটির বিষয়ে জানতে পারি।’
এরপরই ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা বাতিলের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে ওয়েঙ্গার বলেন, ‘প্রকল্পটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ছিল একেবারেই প্রয়োজনীয় এবং এ নিয়ে কোনো প্রশ্নই থাকতে পারে না। কারণ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একটি স্বাধীন ফিফা দরকার, যে প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুতি, স্বচ্ছতা ও সততার সঙ্গে আমাদের খেলাটির সেবা করবে।’
ওয়েঙ্গারের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে ফিফার ভেতর-বাইরে চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন লামোর এর আগে অভিযোগ করেছিলেন, ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা সম্পর্কে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মীদের ‘বিভ্রান্ত করা হয়েছিল’।
ইউরোপের বেশ কয়েকটি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও ইনফান্তিনোর ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। ওয়েলস ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে, ২০২৭-২০৩১ মেয়াদে ফিফা সভাপতি হিসেবে ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচনের প্রার্থিতায় তারা আর সমর্থন দেবে না।
ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও ফিফার কাছে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি জানাতে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। এর আগে উয়েফা ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা বাতিলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও স্পষ্ট করে দেয়, তারা ফিফা সভাপতির ওপর ‘আস্থা হারিয়েছে’। ইউরোপীয় ফুটবল ক্লাবগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইউরোপিয়ান ফুটবল ক্লাবসের কয়েকটি ক্লাবও পরিকল্পনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলে জানা গেছে।
ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা শুধু বিশ্বকাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রস্তাবিত বাণিজ্যিক কাঠামোর আওতায় ক্লাব বিশ্বকাপের স্বত্বও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এতে ইউরোপীয় ক্লাবগুলো আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। কারণ ক্লাব বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব নিয়ে ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর সঙ্গে ফিফার যৌথ উদ্যোগে কাজ করার যে পরিকল্পনা ছিল, নতুন প্রকল্পটি সেটিকেও প্রভাবিত করতে পারত।
ইনফান্তিনো আগামী মার্চে ফিফা সভাপতি হিসেবে চতুর্থ ও শেষ মেয়াদের জন্য নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা রয়েছে। ২১১ সদস্যের ফিফায় জয় পেতে প্রয়োজন হবে অন্তত ১০৬ ভোট। ফলে একের পর এক দেশ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের সমর্থন হারানো ইনফান্তিনোর জন্য এখন শুধু একটি বিতর্ক নয়, বরং আসন্ন ফিফা নির্বাচনকে ঘিরে বড় রাজনৈতিক সংকেত হয়ে উঠছে।
