বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা বাতিলের পর তীব্র চাপের মুখে পড়েছিলেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি বৈঠক করেছে ফিফার শীর্ষ নেতৃত্ব। বৈঠক শেষে ইনফান্তিনোর প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে নিজেদের মধ্যে ঐক্যের বার্তা দিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
বুধবার মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ফিফার মহাসচিব ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রমসহ ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সদস্যরা অংশ নেন। বৈঠক শেষে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ফিফার নেতৃত্ব ইনফান্তিনোর প্রতি ‘পূর্ণ সমর্থন’ পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে ইনফান্তিনোও মহাসচিব ও ফিফা প্রশাসনের প্রতি তার পূর্ণ সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।
বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কই মূলত এই সংকটের সূত্রপাত। ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ নামের একটি নতুন বাণিজ্যিক সংস্থা গঠন করে এর ২০ শতাংশ অংশীদারত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রায় ৪২০ কোটি ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছিলেন ইনফান্তিনো। কিন্তু পরিকল্পনাটি প্রকাশ্যে আসার পর ইউরোপসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত গত শুক্রবার সেটি বাতিল করতে বাধ্য হয় ফিফা।
এরপর ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা সরাসরি জানায়, তারা ফিফা সভাপতির ওপর আস্থা হারিয়েছে। কনকাকাফ ও এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনও পরিকল্পনাটি তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে। কয়েকটি ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ইতোমধ্যে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেছে।
শুধু বাইরের সমালোচনাই নয়, ফিফার ভেতর থেকেও উঠেছিল অসন্তোষের সুর। মহাসচিব গ্রাফস্ট্রম এক অভ্যন্তরীণ বার্তায় এই পুরো ঘটনার জন্য ‘দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ধারাবাহিকতা’র কথা উল্লেখ করেন। ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন লামোরও বলেছিলেন, এই পরিকল্পনা নিয়ে সংস্থার কর্মীদের ‘বিভ্রান্ত করা হয়েছিল’ এবং এটি ছিল ‘এক ব্যক্তির প্রকল্প’।
তবে রাবাতের বৈঠকের পর সেই বিভাজনের বদলে ঐক্যের ছবি তুলে ধরতে চেয়েছে ফিফা। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বিতর্কিত পরিকল্পনার প্রক্রিয়ায় ফিফার কাউন্সিল ও সদস্য দেশগুলোকে যথেষ্টভাবে সম্পৃক্ত না করাটা ভুল ছিল। এ জন্য সদস্যদের কাছে ক্ষমাও চেয়েছে সংস্থাটি এবং ভবিষ্যতে এমন প্রক্রিয়া পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ফিফা বলেছে, ‘ফিফা কাউন্সিল ও সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না এবং বিষয়টি ভিন্নভাবে পরিচালনা করা উচিত ছিল।’
তবে একই সঙ্গে নিজেদের অবস্থানও স্পষ্ট করেছে ফিফা। সংস্থাটি জানিয়েছে, বিতর্কিত প্রস্তাব প্রত্যাহারের পর ‘ফিফার সততা, সুশাসন ও যথাযথ প্রক্রিয়া নিয়ে আর কোনো আক্রমণ সহ্য করা হবে না।’
এদিকে ইনফান্তিনোর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে আগামী মার্চের নির্বাচন। ২০৩১ সাল পর্যন্ত চতুর্থ মেয়াদে ফিফার সভাপতি হতে চান তিনি। যদিও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে শক্ত কোনো প্রার্থী সামনে আসেননি, তবুও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তার অবস্থানকে আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত করে তুলেছে।
অন্যদিকে আফ্রিকার বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ফুটবল প্রশাসক ইতোমধ্যে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন বা ক্যাফ এখনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান না নিলেও মহাদেশটির ৫৪টি ভোট ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কাতার, কুয়েত, লেবানন, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনও তার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, ২১১টি সদস্য দেশের প্রত্যেকটির ভোটের মূল্য সমান। ফলে বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল কিংবা জার্মানির ভোট যেমন একটি, তেমনি র্যাঙ্কিংয়ের তলানিতে থাকা সান মারিনোর ভোটও একটি।
