শিক্ষার্থী-শিক্ষক কিংবা পেশাজীবী সবাই যার যার মতাদর্শ অনুসারে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত থাকবেন বা সচেতন থাকবেন এটা কোনো অযৌক্তিক বিষয় নয়। তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন না ঘটায় বা বিঘ্ন ঘটার কারণ না হয়—সে ব্যাপারে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ শনিবার দুপুরে আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
এর আগে তিনি জাতীয় সংসদের এলডি হলে আয়োজিত এই সমাবেশের উদ্বোধন করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মার্কিন ব্যবসায়ী ও উদ্ভাবক থমাস এডিসন একটি কথা বলেছিলেন, ভবিষ্যৎ চিকিৎসক কোনো ওষুধ দেবে না। বরং তিনি রোগীদের মানবদেহের যত্ন এবং খাদ্যাভ্যাস ও রোগ প্রতিরোধের বিষয় আগ্রহী করে তুলবেন। থমাস এডিসনের এই চিন্তার সঙ্গে বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য সেবার একটি মিল হয়তো আপনারা খুঁজে পাবেন।
তিনি বলেন, চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের নীতি হচ্ছে, প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিওর। বর্তমান সরকার মনে করে, মানুষকে যদি শুরুতেই রোগের উৎপত্তির কারণ এবং প্রতিকার সম্পর্কে সচেতন করা যায়, তাহলে খুব সম্ভবত সহজেই রোগ নিরাময় করা সম্ভব। এই চর্চাই ইউরোপে এখন ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে।
বর্তমান সরকার আরও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করতে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা নাগরিকদেরকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতন ও সতর্ক করবেন। তবে স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকদের নেতৃত্ব দিতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, ‘শিক্ষার্থী কিংবা পেশাজীবীরা রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট থাকবেন কিংবা কতটা থাকবেন এটা নিয়ে বিভিন্ন মহলে একটি আলোচনা আছে। এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতও রয়েছে। আমার মতটি আমি আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেহেতু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রায় সকল কাজকেই প্রভাবিত করে, সেহেতু শিক্ষার্থী-শিক্ষক কিংবা পেশাজীবী সবাই যার যার মতাদর্শ অনুসারে রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত থাকবেন বা সচেতন থাকবেন এটা কোনো অযৌক্তিক বিষয় নয়। তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন না ঘটায় বা বিঘ্ন ঘটার কারণ না হয়, সেটি হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
এই ব্যাপারে ড্যাবের চিকিৎসকদের সতর্ক থাকার জন্য আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এসে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন খুব সম্ভবত প্রত্যেকটি খাতে সামগ্রিকভাবে সারা বাংলাদেশে এখন সময়ের একটি কঠিন দাবি। এটা আমরা সবাই সেটি অনুভব করতে পারি, বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর থেকে।
এ সময় ড্যাবের পক্ষ থেকে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও চিকিৎসা সেবাকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করার লক্ষ্যে বেশ কিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
সে প্রসঙ্গে চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনাদের অবস্থান থেকে যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে এই দাবিগুলো হয়তোবা খুব একটু অযৌক্তিক নয়। তবে এ ব্যাপারটিও কিন্তু আমাদের সবার বিবেচনার মধ্যে থাকা উচিত, সেটি হচ্ছে বর্তমান সরকার যখন দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে—আমরা একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র পেয়েছি বলা যায়। আমরা পেয়েছি একটি দুর্বল অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন, ভঙ্গুর শিক্ষা, ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। সেই অবস্থা থেকে সরকার চেষ্টা করছে সারা দেশকে সফলভাবে ঘুরিয়ে দাঁড় করাতে পারে।’
‘এমন পরিস্থিতিতেও রাষ্ট্র-রাজনীতি, শাসন-প্রশাসনে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগীরা কিন্তু বসে নেই। সাম্প্রতিক সময়ে আপনারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, একটি চক্র খুব সুকৌশলে জ্বালানি কিংবা বিদ্যুৎ সেক্টরকে অস্থীতিশীল করার জন্য বেশ সক্রিয়। তারা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর বক্তব্য উপস্থাপন করছে। সরকার কিন্তু একবারও অস্বীকার করেনি যে, বাংলাদেশের বহু মানুষ এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংক্রান্ত বিষয়ে অনেক কষ্ট ভোগ করছেন। আমরা জানি এটি।’
‘আমি মাত্র উল্লেখ করেছি, আমরা সামগ্রিকভাবে একটি ভঙ্গুর অবস্থা বা ব্যবস্থা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। গ্যাস বা জ্বালানি বা পেট্রোল সামগ্রিকভাবে জ্বালানি খাতে যে অপরিকল্পিতভাবে কার্যক্রমগুলো নেওয়া হয়েছিল অথবা বিগত দিনগুলোতে কোনো নির্দিষ্ট মহলকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য যেসব নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, তার খেসারত সমগ্র দেশ, দেশের মানুষ ও বর্তমান সরকারকে বহন করতে হচ্ছে,’ যোগ করেন তিনি।
অপরিকল্পিত কার্যক্রম যেগুলো জ্বালানি খাতকে বিপদের মুখে ফেলে দিয়েছে, সেগুলো ঠিক করতে এবং নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জ্বালানি খাতের সংকট থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে ধীরে ধীরে বের করে নিয়ে আসতে সরকার কাজ শুরু করেছে বলেও জানান তারেক রহমান।
এ সময় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘আপনাদের সহযোগিতা-সমর্থন ছাড়া অবশ্যই সরকারের পক্ষে এগুলোকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।’
স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাস্থ্য সেবার পরিসর বাড়াতে সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে, ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, চিকিৎসকরা যদি সেবার মানসিকতা নিয়ে নিজেদেরকে নিবেদিত না রাখেন, তাহলে এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে কিন্তু আমাদের সফলতা আসবে না।’
‘আমি জানি, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আপনাদেরকে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। তারপরও কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত অবহেলা বা দায়িত্ব পালনে সৈতুল্য একদিকে সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, অপরদিকে চিকিৎসক কিংবা চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কেও জনমনে অনাস্থা তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে দেশের মানুষ চিকিৎসকদের কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল ও মানবিক ভূমিকা প্রত্যাশা করে। আসুন, আমরা সকলে মিলে এমন একটি চিকিৎসাবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষ মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবা পাবে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হবে না আর,’ যোগ করেন তিনি।
