ছাত্রলীগকে (নিষিদ্ধ ঘোষিত) যেখানে ভালো উপদেশ দিয়েও থামানো যেত না, সেখানে ওবায়দুল কাদের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে তাদের আন্দোলন দমনের নির্দেশ দিয়ে উসকে দিয়েছিলেন বলে আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে (আইসিটি) জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
আজ মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল-২ এ যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় এ কথা বলেন তিনি।
এক প্রসিকিউটর ট্রাইব্যুনালকে জানান, ওবায়দুল কাদেরের আদেশে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়েছিল।
হামলার বিবরণ দেওয়ার সময় চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ভালো অ্যাডভাইস (উপদেশ) দিয়েও যেখানে ছাত্রলীগকে অপরাধমূলক কার্যক্রম থেকে থামানো যেত না, সেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় উসকে দিয়ে আন্দোলনকারীদের দমনের নির্দেশ দিয়েছিলেন ওবায়দুল কাদের।’
প্রসিকিউশন আদালতে কাদের ও ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের মধ্যকার একটি ফোনালাপের অডিও শোনায়। সেখানে সাদ্দামের উদ্দেশ্যে কাদেরকে বলতে শোনা যায়, ‘পিটাও না কেন? মারো না কেন ওদের? প্রশ্রয় দাও কেন?’
জুলাই অভ্যুত্থান সংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় কাদেরসহ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের ৭ নেতার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন পঞ্চম দিনের যুক্তিতর্ক শেষ করেছে আজ।
আদালতের কার্যক্রম শেষে চিফ প্রসিকিউটরের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান যে তিনি ছাত্রলীগের বিষয়ে আদালতে কী বলেছেন। জবাবে তিনি বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালে কাদেরের একটি ফোনালাপ শোনানো হয়েছে, সেখানে তিনি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মারধরের নির্দেশ দিয়েছিলেন।’
‘তার (কাদেরের) নির্দেশের পর ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা গুলি করে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে,’ বলেন তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, ‘আমি আদালতকে বলেছি যে ছাত্রলীগ কোনো নিয়ম-নীতি বা শৃঙ্খলা মানে না এবং তারা ভালো উপদেশও শোনে না। এই ধরনের একটি ছাত্রসংগঠনকে যদি আবার উসকানিমূলক নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং এভাবে উৎসাহিত করা হয়, তবে তা আর নিয়ন্ত্রণে থাকে না।’
‘পুরো জুলাই অভ্যুত্থান জুড়ে আমরা এই উসকানির ভয়াবহ পরিণতি দেখেছি,’ যোগ করেন তিনি।
প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালকে জানায়, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়ে আহত শিক্ষার্থীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গেলে সেখানেও আহতদের ওপর নতুন করে হামলা চালানো হয় এবং তাদের চিকিৎসা নিতে বাধা দেওয়া হয়—যা সাধারণত যুদ্ধের সময়ও ঘটে না।
প্রসিকিউটর গাজী মোনোয়ার হোসেন তামিম বলেন, ‘প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহারই এ ধরনের সহিংসতার ব্যাপকতা ও সুসংগঠিত রূপের প্রমাণ। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এই যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।’
বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে তামিম জানান, ব্যবহৃত গোলাবারুদের প্রায় ৬৫ শতাংশই ছিল প্রাণঘাতী, যার মধ্যে ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটার গুলিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তিনি জানান, ট্রাইব্যুনালে পুলিশের উপস্থাপন করা নথিপত্র অনুযায়ী আন্দোলন চলাকালে তিন লাখের বেশি গুলি চালানো হয়। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই ৯৫ হাজারের বেশি গুলি করা হয়।
প্রসিকিউটর তামিম জানান, দেশের ৪০ জেলায় পুলিশ প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। আর আন্দোলনকারী, আওয়ামী লীগ কর্মী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছিল ৫০ জেলায়।
তিনি বলেন, ‘হামলাগুলো যে সুপরিকল্পিত এবং ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছিল, তা প্রমাণ করতেই আমরা এসব তথ্য-প্রমাণ আদালতের সামনে তুলে ধরেছি।’
