অবশেষে জামিনে মুক্তি পেলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সেই সোনা মিয়া

রোহিঙ্গার পরিচয় জালিয়াতি ও তদন্তে গাফিলতির কারণে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সোনা মিয়া অবশেষে অন্তর্বর্তীকালীন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

মামলায় গ্রেপ্তারের প্রায় দুই মাস পর আজ শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান সোনা মিয়া।

কারাগার থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বলেন, কারাগারে কাটানো প্রায় দুই মাসের প্রতিটি দিন আমার কাছে একেকটি বছরের মতো মনে হয়েছে।

সোনা মিয়া বলেন, অসহ্য কষ্টে দিনগুলো কেটেছে। আমার বাড়ি কক্সবাজার শহরে। আমার আত্মীয়স্বজন, ভাই-বোন সবাই এখানে থাকেন। পুলিশ যদি একটু খোঁজখবর নিত, তাহলেই সত্যটা জানতে পারত। কিন্তু তাদের গাফিলতির কারণে আমার জীবনটা নরক হয়ে গেছে।

‘আমি যে দুর্ভোগের শিকার হয়েছি, এর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই’, বলেন তিনি।

২০২০ সালের ২ মার্চ কক্সবাজার সদর থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একজন ছিলেন রোহিঙ্গা যুবক রমজান। তিনি সোনা মিয়ার পূর্বপরিচিত। রমজান নিজের পরিচয় গোপন করে সোনা মিয়ার নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ওই ‘সোনা মিয়াকে’ মামলায় দ্বিতীয় আসামি করা হয়। তার বাবার নাম মৃত নজির আহম্মদ ও ঠিকানা কক্সবাজারের কুতুবদিয়া পাড়া ও রামুর গর্জনিয়া উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগপত্রে তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক মানস বড়ুয়া বলেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়া যে নাম ও ঠিকানা দিয়েছেন, তা সঠিক কি না যাচাই করা সম্ভব হয়নি। জামিনে মুক্তি পেলে তিনি পালিয়ে যেতে পারেন, এমন আশঙ্কায় তাকে কারাগারে রাখার আবেদনও করেন তিনি।

তদন্তের সময় পুলিশ তার পরিচয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও গ্রেপ্তার ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি।

কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘২০২২ সালের ১৩ জুন সোনা মিয়া পরিচয়ে থাকা রমজান জামিনে মুক্ত হয়ে আত্মগোপনে চলে যান। এরপর তিনি আর আদালতে হাজির হননি।’

গত বছরের ২৫ নভেম্বর আদালত এ মামলায় সোনা মিয়াসহ দুজনকে মৃত্যুদণ্ড, দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও একজনকে খালাস দেন।

প্রায় ছয় বছর পর গত ২৪ জুন রামু থেকে প্রকৃত সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরে তিনি আদালতকে জানান, তিনি এই মামলার আসামি নন এবং কখনো ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার বা কারাগারে ছিলেন না।

আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে ৫ জুলাই প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি আসলে মো. রমজান। তিনি নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।

ওসি মোহাম্মদ আলী বলেন, সোনা মিয়ার পরিচয় ব্যবহার করতে জাল জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করেছিলেন রমজান।

পুলিশ জানায়, রমজান ও সোনা মিয়া একসময় একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একসঙ্গে থাকতেন। পরে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়া পাড়ায় একই কক্ষে থাকতেন তারা। এই পরিচয়ের সূত্রে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন সনদে থাকা তথ্য জানতে পারেন রমজান এবং তা ব্যবহার করে তার পরিচয় ধারণ করেন।

মোহাম্মদ আলী আরও বলেন, এ মামলায় গ্রেপ্তার আরেক আসামি ও সোনা মিয়া দুজনেই পালিয়ে যাওয়া ওই ব্যক্তিকে রমজান হিসেবে শনাক্ত করেছেন। তারা জানিয়েছেন, রমজান কুতুপালংয়ে বসবাসকারী পুরোনো রোহিঙ্গা।

কক্সবাজার জেলা কারাগারের পুরোনো ও সাম্প্রতিক নথিপত্র পর্যালোচনা করেও দুইজনের মধ্যে বড় ধরনের অমিল পাওয়া যায়। কারাগারের নথিতে থাকা ছবি, আঙুলের ছাপ ও শনাক্তকারী চিহ্নের মধ্যে কোনো মিল ছিল না।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান ডেইলি স্টারকে বলেন, তদন্তের শুরু থেকেই গুরুতর গাফিলতি ছিল। জন্মনিবন্ধন সনদটি যথাযথভাবে যাচাই না করে, সনদের সঙ্গে সংযুক্ত ছবি পরীক্ষা না করে এবং ঠিকানায় গিয়ে ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত না করেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, গত বুধবার আদালত শর্তসাপেক্ষে সোনা মিয়াকে মুক্তির আদেশ দেন।

সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আমার স্বামী একজন দিনমজুর। তিনি কখনো কোনো অপরাধ করেননি এবং কারাগারেও যাননি।

তিনি আরও বলেন, রমজানের পরিচয় জালিয়াতির কারণে আমার স্বামী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হয়েছেন। তদন্তের সময় পুলিশ আমাদের বাড়িতে এসে সোনা মিয়ার পরিচয় যাচাই করলে এই ভুল এড়ানো যেত।

এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান জান্নাতুল।

Related Articles

Latest Posts