স্কোরবোর্ড বলছে, অস্ট্রেলিয়া ইনিংস হার থেকে এখনও ৬৭ রান দূরে। আর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক এক জয়ের সামনে। তবু ডারউইনের আকাশে জয়ের আলো স্পষ্ট হয়ে ওঠার মুহূর্তেও মেহেদী হাসান মিরাজের কণ্ঠে উচ্ছ্বাস নেই। বরং সতর্ক এই অলরাউন্ডার মনে করিয়ে দিলেন, টেস্ট ম্যাচে শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি।
শনিবার ডারউইন টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ৪ উইকেটে ১৬১ রান। অর্থাৎ চতুর্থ দিনের শুরুতেই বাংলাদেশ যদি আরও কিছু উইকেট তুলে নিতে পারে, তাহলে অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংস ব্যবধানে হারানোর দারুণ সুযোগ তৈরি হবে।
কিন্তু মিরাজের ভাবনায় এখনই নেই ইনিংস জয়ের হিসাব। তার কাছে আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অস্ট্রেলিয়ার আরও কয়েকটি উইকেট তুলে নেওয়া এবং রান আটকে রাখা।
দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে মিরাজ বলেন, ‘আমরা আসলে ওইভাবে চিন্তা করছি না। আমরা চেষ্টা করছি ভালো জায়গায় বল করার জন্য। কারণ প্রত্যেকটা উইকেট নিতে গেলে কষ্ট করে বল করতে হবে। যে উইকেটগুলো পেয়েছি, অনেক কষ্ট করেই নিতে হয়েছে।’
বাংলাদেশের এই সতর্কতার পেছনে অবশ্য যথেষ্ট কারণও আছে। ডারউইনের উইকেট এখনো ব্যাটিংয়ের জন্য যথেষ্ট ভালো। তৃতীয় দিন যত গড়িয়েছে, উইকেট বরং ব্যাটারদের জন্য আরও সহায়ক হয়েছে বলেই মনে করছেন মিরাজ। তাই দ্রুত ফলের কথা না ভেবে ছোট ছোট লক্ষ্য নিয়েই এগোতে চান তিনি, ‘এই রানের ভেতর যদি আরও তিন থেকে চারটা উইকেট নিতে পারি, তখন আমাদের জন্য ইজি হবে। অথবা রানের টার্গেটটাও বেশি থাকবে না।’
তৃতীয় দিনে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে শুরুটাও হয়েছিল বাংলাদেশের পক্ষে। দ্বিতীয় ওভারেই জ্যাক ওয়েদারল্ডকে বোল্ড করে ফেরান হাসান মাহমুদ। পরে ট্রাভিস হেডকেও ফেরান এই পেসার। তাইজুল ইসলামের বলে মার্নাস লাবুশেনের বিদায়ের পর দিনের শেষ ঘণ্টায় সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে মিরাজের হাত ধরে।
৮৮ বলে ৪৪ রান করা স্মিথ মিরাজের বল মিড অনে ঠেলে সিঙ্গেল নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শটটি ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। ক্যাচ তুলে দিয়ে ফিরে যান অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটারদের একজন। স্মিথের বিদায়ের পরই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশের হাতে চলে আসে।
তবে মিরাজ জানেন, অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে এখনো যথেষ্ট শক্তি আছে। ক্রিজে থাকা ক্যামেরন গ্রিন ও অ্যালেক্স কেয়ারি দিনের শেষ পর্যন্ত ৩৯ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়েছেন। গ্রিন ৪৩ এবং কেয়ারি ১৯ রানে অপরাজিত। তাদের পরও অস্ট্রেলিয়ার হাতে রয়েছে অভিজ্ঞ ব্যাটাররা।
সেই কারণেই মিরাজের চোখ এখন শুধু পরের দিনের প্রথম সেশনে, ‘ভবিষ্যতের কথা তো আমরা বলতে পারি না। তবে আমরা চেষ্টা করতে পারি ফার্স্ট সেশনটা আমাদের করে নেওয়ার জন্য। ফার্স্ট সেশনটা খুবই ইম্পর্টেন্ট। আমরা যদি উইকেট নিতে পারি, তাহলে আমাদের জন্য ভালো হবে।’
অস্ট্রেলিয়াকে দ্রুত অলআউট করার পাশাপাশি বাংলাদেশ যে রানও আটকে রাখতে চাইছে, সেটিও পরিষ্কার করেছেন মিরাজ। তার মতে, উইকেট খুব বেশি টার্ন না করলেও ধৈর্য ধরে সঠিক জায়গায় বল করাই স্পিনারদের মূল কাজ। তাইজুল ইসলামের সঙ্গে তিনিও রান আটকে রেখে চাপ তৈরির চেষ্টা করেছেন।
‘এখনো উইকেটটা যেভাবে আছে, ওইরকম বেশি টার্ন করছে না। আমরা স্পিনাররা জাস্ট পেশেন্স রেখে বল করার চেষ্টা করছি এবং ভালো জায়গায় বল করার চেষ্টা করছি। এখানে যদি রান কনটেইন করতে পারি, তাহলে উইকেটের চান্সটা বেশি থাকে,’ বলেন মিরাজ।
এই টেস্টে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটাও কম নাটকীয় নয়। প্রথম ইনিংসে মাত্র ৫৮ রানে অলআউট হওয়ার পর খুব কম মানুষই হয়তো ভাবতে পেরেছিলেন, এই ম্যাচের তৃতীয় দিন শেষে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস হার নিশ্চিত করার অবস্থায় থাকবে। কিন্তু সেই ধাক্কার পরই দলকে বিশ্বাস ধরে রাখতে বলেছিলেন মিরাজরা।
এমনকি ৫৮ রানে অলআউট হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ডের সঙ্গে কথা বলার সময় মিরাজ বলেছিলেন, ‘ইনশাল্লাহ আমরা অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে জিতব।’
সেই আত্মবিশ্বাসের কারণও ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। মিরাজের মতে, কোনো কিছু অর্জন করতে হলে আগে সেটি করার বিশ্বাস থাকতে হয়। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে বাংলাদেশ আগেও টেস্ট জিতেছে, সেই সাফল্যই হয়তো তাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, অসম্ভব কিছু নয়।
‘কেউ কখনো যদি কোনো কিছু চিন্তাই না করে, সেটা তো করে দেখানো সম্ভব হয় না। আমরা চেষ্টা করি এটা চিন্তা করার জন্য যে, আমরা জিততে পারি এই কন্ডিশনেও। কারণ রেফারেন্স হিসেবে যদি আপনি দেখেন, নিউজিল্যান্ডে আমরা ম্যাচ জিতেছিলাম। আমরা পারি, এর আগেও করেছি। ওই বিশ্বাস থেকেই এসেছে,’ বলেন মিরাজ।
