ককরোচের পর এবার মোদির নতুন মাথাব্যথা ‘দিমাগি নকশাল’

গত ১৫ আগস্ট ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্যে একদল মানুষকে ‘দিমাগি নকশাল’ আখ্যা দেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

এরপর থেকে ভারতীয়দের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এই শব্দযুগল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘দিমাগি নকশাল’ ট্রেন্ডিং হতে থাকে। শব্দ দুটি নিয়ে তৈরি হয় অসংখ্য হ্যাশট্যাগ। শত শত পোস্টও আসছে এ নিয়ে।

আজ মঙ্গলবার এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়াসহ ভারতের একাধিক গণমাধ্যমে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

নকশালপন্থিদের সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনের বিষয়টি নিয়ে কথা বলার সময় মোদি সতর্ক করেন, আদর্শগত হুমকি এখনো দূর হয়নি।

তিনি বলেন, ‘অস্ত্রধারী নকশালদের নির্মূল করা গেলেও সমাজ থেকে “দিমাগি নকশালদের” চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করার সময় এসেছে।’

তার এই মন্তব্যের জেরে শুরু হয় রাজনৈতিক বিতর্ক। ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে ঠিক কাদের কথা বুঝিয়েছেন মোদি, তা নিয়ে শুরু হয় জল্পনা-কল্পনা।

অল্প সময়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে ‘দিমাগি নকশাল পার্টি’ নামের একটি পেজ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজারো ফলোয়ার, পোস্ট ও রিঅ্যাকশন পায় পেজটি।

অনেকের মনেই প্রশ্ন আসে, এই ‘দিমাগি নকশাল পার্টিও’ কি ককরোচ জনতা পার্টির মতো নরেন্দ্র মোদির জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে চলেছে?

তবে এই অ্যাকাউন্টের নেপথ্যে কে আছেন, তা জানা যায়নি।

অল্প সময়ের মধ্যে লাখো ফলোয়ার পায় পেজটি। তবে অনেক ইউজার অভিযোগ করেছেন, পেজটি এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হ্যাকারদের হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। 

জেন জি ভাষা, মিম, ব্যঙ্গ ও রাজনৈতিক বার্তার মিশেলে তৈরি প্ল্যাটফর্মটি নেটিজেনদের নজর কেড়ে নেয়। 

জেন জি ভাষা, মিম, ব্যঙ্গ ও রাজনৈতিক বার্তার মিশেলে তৈরি এই প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যে নজর কেড়েছে।

এর আগে একই কায়দায় সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতির মন্তব্যের জেরে ককরোচ জনতা পার্টির জন্ম হয়েছিল।

মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক উন্মুক্ত আদালতে মন্তব্য করেন, কিছু ‘পরজীবী’ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আক্রমণ করছে। তিনি কিছু তরুণকে ‘আরশোলা বা তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘যাদের চাকরি নেই, পেশায় কোনো জায়গা নেই, তারা মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্মী, আরটিআই অ্যাকটিভিস্ট বা অন্য কর্মী হয়ে সবাইকে আক্রমণ শুরু করে।’

এই মন্তব্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়, বিশেষ করে জেন জি প্রজন্মের মধ্যে। বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের দীর্ঘ শাসন নিয়ে আগে থেকেই হতাশ তরুণদের একাংশ বিচারপতির মন্তব্যে আরও ক্ষুব্ধ হন।

ক্ষোভ বাড়তে থাকলে এক্সে (সাবেক টুইটার) যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে জনসংযোগ বিষয়ে সদ্য স্নাতক হওয়া ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপকে লেখেন, ‘যদি সব তেলাপোকা এক হয়ে যায়?’

এরপর তিনি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলেন। এটি মূলত মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের ব্যঙ্গাত্মক রূপ।

বাকিটা ইতিহাস।

‘ক্ষোভ’ থেকে জন্ম নেওয়া দলটি এখন নরেন্দ্র মোদির জন্য যথেষ্ট মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করে অনলাইনভিত্তিক দলটি। বিজেপির আদলে সিজেপি নামে পরিচালিত দলটির ফলোয়ারের সংখ্যা প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে।

কংগ্রেসের সাবেক নেতা ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি. চিদম্বরম পোস্ট করে জানিয়েছেন, ‘আমি একজন দিমাগি নকশাল হতে পেরে গর্বিত।’

আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেন, ‘আমিও একজন দিমাগি নকশাল, কারণ আমি দেশপ্রেমিক।’

জম্মু-কাশ্মীরভিত্তিক পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতিও ‘দিমাগি নকশাল’ ধারণার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

পরিস্থিতি সামলাতে প্রধানমন্ত্রী মোদির মন্তব্যের বাড়তি ব্যাখ্যা দিয়েছেন দলটির জ্যেষ্ঠ নেতা কিরেন রিজিজু।

তিনি জানান, বিরোধী দলের নেতাদের উদ্দেশ্য করে এই মন্তব্য করেননি মোদি।

এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, যারা মাওবাদের সমর্থক, দেশের সংবিধানকে মান্য করেন না, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন করেন এবং দেশের বাকি অংশ থেকে উত্তর-পূর্বের ‘চিকেন নেক’ আলাদা করে ফেলতে চান, শুধু তাদেরকেই প্রধানমন্ত্রী ‘দিমাগি নকশাল’ আখ্যা দিয়েছেন।

তবে তার এই ব্যাখ্যা কাজে আসেনি। এমনকি তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন, এটি তার একান্তই নিজস্ব ব্যাখ্যা।

ককরোচ জনতা পার্টির প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাসের মত, শুধু সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেই কেন একদল মানুষকে এভাবে ‘দিমাগি নকশাল’ আখ্যা দেওয়া হবে?

মোদিকে উদ্দেশ করে তিনি এক্সে পোস্ট করে বলেন, ‘দিমাগি নকশাল বা এ ধরনের অন্য কোনো কিছু কোনো কাজে আসবে না।’

দিমাগি নকশালরা ককরোচ জনতা পার্টির মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম হতে পারবে কি না, সেটা এখনো বলার সময় আসেনি। 

তবে মোদির বক্তব্য ও এর জেরে দ্রুত বড় হতে থাকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই প্ল্যাটফর্ম ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভারতের তরুণ-তরুণীরা এখন রাজনীতির বিষয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। তারা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে প্রথাগত দল বেছে না নিয়ে নিজেদের পথ নিজেরাই তৈরি করে নিচ্ছে।

এখন এটাই দেখার বিষয়, ককরোচের পাশাপাশি দিমাগি নকশালরাও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর জন্য নতুন যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায় কি না।

Related Articles

Latest Posts